ভারত চায় ১১ জঙ্গির তথ্য, বাংলাদেশ চায় ৪৬

প্রকাশিত: November 19, 2014 | সময়: 9:18 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: বর্ধমান বিস্ফোরণের হোতাসহ ভারতে সক্রিয় জঙ্গিদের মধ্যে ১১ জন জঙ্গির ব্যাপারে বাংলাদেশের সহায়তা চেয়েছে ভারত। দেশটির জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) এ অপরাধীদের কিছু ছবি, মোবাইল নম্বরসহ নানা তথ্য হস্তান্তর করেছে র‌্যাবের কাছে। তবে তারা ভারত না বাংলাদেশের নাগরিক, তাদের অবস্থান কোথায় তা জানাতে পারেনি এনআইএ।

এদিকে র‌্যাবের পক্ষ থেকেও মঙ্গলবার ভারতে পালিয়ে থাকা ৪৬জন অপরাধীর তালিকা দেয়া হয়েছে ভারতীয় প্রতিনিধি দলকে। সেখানে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিসহ পাঁচ জন এবং পুরস্কার ঘোষিত দুর্র্ধষ সন্ত্রাসীসহ ৪১ জনের তথ্য রয়েছে।

র‌্যাবের দায়িত্বশীল সূত্র বাংলামেইলকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এনআইএ প্রতিনিধি দলের সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তরে আলাদা দু’টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই বৈঠকেই পলাতক জঙ্গিদের বিষয়ে কথা বলেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।

বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ভারত যেসব জঙ্গির সন্ধানে মাঠে নেমেছে তাদের ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। অনেক কিছুই রয়েছে অনুমানভিত্তিক। তবে জঙ্গিবাদ নির্মূলে দু’দেশের কঠোর অবস্থানের কারণে যৌথভাবেই অনুসন্ধান কাজ শুরু হয়েছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘এখানে জঙ্গি বিষয়ে তদন্তই গুরুত্ব পেয়েছে। তারা ১১ জনের তালিকা দিয়েছেন। আমারও কিছু তথ্য দিয়েছি।’

গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘উভয় দেশের অপরাধীদের তথ্য ও ছবি বিনিময় করা হয়েছে। ওপেন সোর্স থেকে জঙ্গিদের পরিকল্পনার ব্যাপারে অনেক তথ্য পাওয়া গেলেও এনআইএ তথ্যের সঙ্গে তার মিল নেই। ভারতে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক মজুদ ও অর্থায়নের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে বর্ধমানের ঘটনায় এনআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার শেখ রহমতুল্লাহ সাজিদ যে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের মাসুম সে বিষয়ে পুলিশ অনেকটা নিশ্চিত হতে পেরেছে।’
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এনআইয়ের দেয়া তালিকায় কাউসার নামের এক যুবক রয়েছেন। তার ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের বীরভুম বোলপুর বলে উল্লেখ আছে। তবে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার কাউসার বাংলাদেশের নাগরিক বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তার ছবি না পেয়ে একটি স্কেচ সংগ্রহ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মঙ্গলকোর্ট কেষ্টবাটির মাওলানা ইউসুফ শেখ ওরফে বক্কর ওরফে মোহাম্মদ ইউসুফের পিতার নাম হাফিজ শেখ। ৩২ বছর বয়সী এ ব্যক্তির উচ্চতা ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। তালহা শেখ নামে বীরভুম কিরনহার এলাকার বাসিন্দাকেও বাংলাদেশি নাগরিক বলে সন্দেহ এনআইএর।

মুর্শিদাবাদ রঘুনাথগঞ্জের রেজাউল করিম বর্ধমানে বাবুরবাগ এলাকাতেও বসবাস করেন। আনুমানিক ২৬ বছরের এ যুবকের পিতার নাম আব্দুর লতিফ। বীরভুম কীরনাহার এলাকার আমজাদ আলী শেখ ওরফে কাজলের (৩০) পিতার নাম শুকুর শেখ। বর্ধমান মঙ্গলকোট কুলসোনার আবুল কালাম ওরফে আজাদের বয়স ২৩ বছর। বীরভুম বোলপুর এলাকাতেও তার বসবাস রয়েছে। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার এ যুবক অন্যদের মতো বর্ধমান বিস্ফোরণের পর বাংলাদেশে আত্মগোপন করেছে বলে ভারতীয় গোয়েন্দারা সন্দেহ করছে। এসব বিষয়ে যাচাইয়ে র‌্যাব ও পুলিশসহ বাংলাদেশি গোয়েন্দাদের সহায়তা চেয়েছেন তারা।

অন্য পলাতকদের মধ্যে রয়েছে শাহানুর আলম ডক্টর (৩৩)। তার পিতার নাম মজিবর রহমান। বাড়ি আসামের স্বার্থেবারী চাতালা এলাকাতে। বর্ধমান মঙ্গলকোর্ট শিমুলিয়া এলাকার আব্দুর রহমান শেখের ছেলে বুরহান শেখ (২৯), বীরভুম বোলপুর এলাকার প্রয়াত মন্টু শেখের ছেলে হাবিবুর রহমান শেখ (২৪) এবং নদীয়া থানারপাড়া এলাকার জোয়াদ আলী শেখের ছেলে জহিরুল শেখ (২৬) এ তালিকায় রয়েছে। ২৬ বছর বয়সী আরেক যুবকের ছবি গোয়েন্দারা সংগ্রহ করলেও নাম ও পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পাননি। এ সন্দেহভাজন ১১ জনকে খুঁজতে ইতিমধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দারা নানারকম প্রচেষ্টা শুরু করেছে। সেক্ষেত্রে তাদের বাংলাদেশে কারও কারও সাথে যোগোযোগের তথ্যসূত্রে তারা বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। সেই সূত্র নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

এদিকে র‌্যাবের পক্ষ থেকে এনআইএর কাছে যেসব অপরাধীর তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে তাদের মধ্যে পাঁচজন দুর্র্ধষ জঙ্গি। ভারতে পলাতক এসব জঙ্গিদের মধ্যে রয়েছেন- ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আবু সাইদ ওরফে মাহফুজ ওরফে সোহেল (৩১), যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমন ওরফে বোমারু মিজান ওরফে হারুন ওরফে কামরুল (৩৫); ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে সজীব ওরফে তাওহীদ (৩৫); আনোয়ারুল ইসলাম ওরফে আনোয়ার হোসেন ওরফে ফারুক ওরফে সাখাওয়াত (৩৬) এবং তরিকুল ইসলাম (৩৫)।

এরা ছাড়াও দুর্র্ধষ সন্ত্রাসী ঢাকার শাহাদৎ হোসেন, ত্রিমতি সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, বিকাশ কুমার বিশ্বাস, মোল্লা মাসুদ, হারিছ আহম্মেদ, শামীম আহমেদ ওরফে আগা শামীম, নরোত্তম সাহা ওরফে আশিক ওরফে রবিন, নয়াটোলার জিসান ওরফে মন্টু, শাহীন শিকদার, খন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয়, জাফর আহম্মেদ ওরফে মানিক, নবীন হোসেন ওরফে নবী, মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে মুকুল, বাবু ওরফে মিরপুর বাবু, আগারগাঁওয়ের মিন্টু, আতাউর রহমান ওরফে আতা, পল্লবীর কালা চাঁন ওরফে চাঁন, কাফরুলের ইব্রাহিম খলিল, কুষ্টিয়ার আমিনুল ইসলাম মুকুল ওরফে বিজয়, শাহীন ওরফে রুমী, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু, কালু, যশোরের আনিসুর রহমান ওরফে ফিঙ্গে লিটন, রাজবাড়ীর অমল কৃষ্ণ মন্ডল, হালিম, ছামাদ মোল্লা ওরফে ছামাদ মেম্বার ওরফে আজিজ কমান্ডার, সাভারের তৌফিকুল আলম খান ওরফে পিয়াল খান, চট্রগ্রামের মামুনুর রশিদ মামুন, সুনিল কান্তি দে, এইচএম আবু তৈয়ব, মোর্শেদ খান, নুুরুল আরম ওরফে এতিম আলম, রজিব দত্ত ওরফে রিংকু, সাজ্জাদ খাঁন, কুমিল্রার শহিদুল ইসলাম ওরফে সুব ওরফে সব্বা, নওগাঁর গৌতম চন্দ্র শীলাল, চপল, মেহেরপুরের মিনহাজ উদ্দিন ওরফে দুখু, এনামুল হক এনা ও সিদ্দিক।

হত্যাসহ বহু অপরাধে অভিযুক্ত এসব সন্ত্রাসী দেশত্যাগের পর ভারতের সম্ভাব্য কোথায় অবস্থান করছে সে সংক্রান্ত তথ্যও র‌্যাব কর্মকর্তারা ভারতীয় গোয়েন্দা প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২ অক্টোবর দুর্গাপূজা চলাকালে ভারতের বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ বিস্ফোরণে বাংলাদেশি নাগরিক ও জেএমবি সদস্য শাকিল আহমেদ ও সুবহান মন্ডল নামে দুজন নিহত হয় বলে গোয়েন্দারা জানতে পারে আটক সন্দেহভাজন জঙ্গিদের মাধ্যমে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) রাজিয়া বিবি ও আমিনা বিবি নামে দু’নারীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাতে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির ভারত-বাংলাদেশে তৎপরতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা পরিকল্পনার তথ্য বেরিয়ে আসে বলে দাবি করা হচ্ছে।

বর্ধমানে বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তের দায়িত্বে থাকা এনআইএ প্রতিনিধিদল তথ্য আদান প্রদানের জন্য গত সোমবার ঢাকায় আসে। দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এনআইএর মহা-পরিচালক শারদ কুমার। এনআইএ প্রতিনিধিরা ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়, পুলিশ সদরদপ্তর ও র‌্যাব সদর দপ্তরে বৈঠক করে অপরাধী গ্রেপ্তারসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় পুলিশ সদর দপ্তরে যান ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সেখানে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বেঠক হয়। সন্ধ্যায় এনআইএর প্রতিনিধিদল র‌্যাব সদর দপ্তর পরিদর্শন করে। সেখানে র‌্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্ণেল জিয়াউল আহসান, আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খানসহ র‌্যাবের উর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকে দু’দেশের পক্ষ থেকেই পলাতক অপরাধীদের তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে। বাংলামেইল২৪ডটকম