বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
শ্রীপুর (গাজীপুর) ঘুরে এসে: শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় নির্মাণাধীন ‘মাওনা ফ্লাইওভার।’ কাজ চলছে বেশ কয়েক মাস ধরে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সালনা থেকে মাওনা চৌরাস্তা পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার পথে দীর্ঘ যানজটে এড়াতে ফ্লাইওভারটির নির্মাণ। আগে ফ্লাইওভারের উল্টা পাশে দোকান ছিল, ছিল বাজার হাট। সেখানে ঠাই ছিল শফিন উদ্দিনের (৫০)। শুধু তিনি নন তার মতো এমন দেড় শতাধিক খুচরা ব্যবসায়ীর।
ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর উচ্ছেদ হয়েছেন তারা। তবে এ নিয়ে শফিন উদ্দিনের কথায় নেই বিন্দুমাত্র অভিযোগের কোনো সুর। জানালেন, দেশ নিয়ে ভাবেন। নিজের জায়গা থেকে, জীবন প্রচেষ্টায় কাজ করে যান। কারণ দেশের উন্নতি মানে প্রত্যেকে যার যার অবস্থানে থেকে নিজ কাজটা সম্পন্ন করা, এমনটাই বিশ্বাস করেন তিনি।
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় শুক্রবারের সরেজমিনে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা হলো তার। নির্মাণাধীন মাওনা ফ্লাইওভার থেকে একটু দূরে বসেছেন তিনি। তবে আগের মতো দোকান নিয়ে নয়, ভ্যান নিয়ে। দৈনিক ৫০ টাকা ভাড়ার চুক্তিতে সারা দিনের জন্য নিয়ে আসেন ভ্যান। ভ্যানে রয়েছে হরেক রকম পণ্য। এই যেমন- গজা, নিমকি, মুরালি, মিষ্টি বাদাম, বিস্কুট, চানাচুর, বাতাসা, কদমা, মনাক্কা ইত্যাদি। আগেও গজা-মুরালিই বিক্রি করতেন। তবে ফারাক এখন আগে স্থায়ী এখন ভ্রাম্যমাণ- জানান তিনি।
শফিন উদ্দিন বলেন, আগে ছাপরা ঘর আকারে দোকান আছিল। উঠায় দিসে ৯ কি ১০ মাস হইবো। আমি শুধু একলাই উঠি নাই, এমন ১২০-১৫০টা দোকান উঠাইসে তারা। আগে অবশ্য নোটিস দিয়ে কইসিলো, তয় কেউ উঠে নাই, হেরপর নিজেরাই আইয়া ভেঙে দিসে। ভাঙনের পর ধার-দেনা কইরা চলসি কয়েকদিন। পরে মাইয়ার জামাইয়ে কিছু হাত বাটাইসে। মোট চাইর মাস বইসা থাকার পর, গিয়ে এই ভ্যান নিয়া নামসি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদিও এডা আমার বাবার দোকান আছিল, তয় কোনো আফসোস নাই গা। সকলের ভালো হইতেসে ফেলাইওভারে, সেখানে আমি একডু হলেও তো কিছু দিবার পারসি।
‘এডাই বা বড় বড়, বড়লোকরা কয়জন দিবার পারে’- প্রশ্ন রাখেন শফিন উদ্দিন।
১৯৯৮ সালে শফিন উদ্দিনের বাবা মারা যাবার পর, তিনি তার ব্যবসার হাল ধরেন। তার আগে তিনি মুরগির ব্যবসা করতেন। শফিন উদ্দিনরা তিন ভাই, চার বোন। সবাই যে যার মতো আলাদা। তিনি পাশের দারোগারচালা এলাকায় থাকেন, বাসাটা অবশ্য নিজের। সঙ্গে তার মা, স্ত্রী ও চার মেয়ে, দুই ছেলে।
শফিন উদ্দিন বলেন, মুরগির ব্যবসারতে সেই সময় গজা-মুরালির দোকান নিয়া ব্যবসা করা অধিক লাভের আসিল। হেই সময় ৫০০ টাকা ডেইলি আয় হইতো। দোকান ছাড়নের সময়ও আয় আছিল ৭০০ কি ৮০০’র হইবো। গজা-মুরালি-নিমকি কেজি এহন শ’ টাকা কইরা। তয় এখন অর্ধেকে নাইমা আইছে আয়। সকাল ৮টার থেইকা রাত ৯টা পর্যন্ত ভ্যান নিয়া খাড়াইয়া থাকলে পেকেটে আসে ৩৫০ থেইকা বেশি হইলে ৪০০।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব খরচ বাদ দিয়া এরমইধ্যে যদি ২০০ টাকা লাভ থাকে; তাইলেই চইলা যায়। ৪ মেয়ে ২ ছেলের মইধ্যে, দুই মেয়ের বিয়া দিসি, বাকি দুইজন ছোট। আর দুই ছেলের প্রত্যেকেই বিয়া করসে। বউ নিয়া অন্য খানে থাকে। সংসার চালাইতে কষ্ট হইলেও দুই মেয়ের জামাই কিছু সাহায্য করে, মাসের কিছু বাজার কইরা দেয়, এর লাইগা কষ্টে থাইকাও কষ্ট নাই-গা।
‘সকাল থেইকা রাত পর্যন্ত খাড়াইয়া থাইকা, সব খরচ বাদ দিয়া পেটেকে যেদিন ২০০টা টাকা থাকে সেদিন আমি খুশি’,- বলেন শফিন উদ্দিন। তিনি উল্লেখ করেন, তার কাছে জীবন মানে দিন শেষে ২০০ টাকা পকেটে থাকা। এটাই তার আকাঙ্ক্ষা। পরিবার-পরিজন নিয়ে ছোট্ট আশা পূরণ যে ওটুকুর মধ্যেই।
জীবন নিয়ে এতো ভাবার কিছু দেখেন না শফিন উদ্দিন। জীবন যেখানে যেমন তেমনটা কেন, এমন এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিজেকে বিব্রত করতে চান না শফিন। নিজের নূন্যতম চাহিদার পূরণই জীবন, এমন ব্যাখ্যা তার চোখে-মুখে-ভাষায়। এই ভ্যান নিয়েও যে তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করছেন তাও কিন্তু নয়। বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাকে তিন কি চার বার ভ্যান ঠেলে চেপে যেতে হলো। ভ্যান নিয়ে কোনো পাকা দোকানের সামনে দাঁড়ানো জো নেই। দাঁড়ানো যায়ও না, দোকানিরা সরে যেতে বলেন। এভাবে একটু ডানে কি, একটু বামে চেপে প্রতিদিনকার কর্মযজ্ঞ সারতে হয় শফিন উদ্দিনকে। বর্তমানে তিনি মাওনা সিটি হাসপাতাল অ্যান্ড ডিজিটাল ল্যাবের সামনে দাঁড়ান। আর শত শত ক্রেতা সাধারণ, বিশেষ করে শিশুদের হাতে তুলে দেন গজা-মুরালির টুকরো।
স্থানীয়দের ভাষায় ‘শফিন কাকা’ বাংলানিউজকে আরো বলেন, ১০ টাকার গজা-মরালিতে ২ডা পিস বেশি দিলে বাচ্চারা যে খুশি হয় যে হাসি দেয়, দিনের পর দিন সে আনন্দের খোরাক হইতে পাইরা কাজ করা ক’জনের নসিবে জুটবো!
‘নিজের জায়গা থেইকা কাজ করি’, খোঁজ করলে এভাবেই শফিন উদ্দিনের মতো লাখো শ্রমজীবী ব্যক্তিত্বের সন্ধান মিলবে দেশের আনাচে-কানাচেতে। যাদের খোঁজ কি কোনো দিন উঠে এসেছে সংবাদ হয়ে? আসলে তাদেরই তো শ্রম-ঘামে এ মাটি হয়েছে সোনার, বাংলাদেশ যাচ্ছে সামনে। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

