বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা : আজ ফেব্রুয়ারি মাসে প্রবেশ করছে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। বিশ্বব্যাপী ক্যালেন্ডারের পাতায় এই মাস কিংবা ২১ তারিখটি আলাদভাবে চিহ্নিত না থাকলেও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য ফেব্রুয়ারি স্বতন্ত্র তাৎপর্য বহন করে আসছে মূলত ‘৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে। কালের বিবর্তনে এখন গোটা ফেব্রুয়ারিই যেন বাংলা ভাষার মাস। ফেব্রুয়ারি যদিও শুরু হয় মাঘের মাঝামাঝি; ২১ ফেব্রুয়ারি যখন আসে, তখন বাংলা পঞ্জিকায় মুখর ফাগুন। ফাগুনের সেই রূপ, রস, শোভা এখন সঞ্চারিত হয়েছে ফেব্রুয়রিজুড়ে। ফেব্রুয়ারি নিছক প্রতীকী অর্থে ফাগুন নয়; বাংলা এখন বিশ্বের কমবেশি ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মেঘালয়, বিহার, উড়িষ্যা, অল্প্রব্দপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও নেপালেও রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাভাষী। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান, মিয়ানমার, আফগানিস্তানেও কর্মসংস্থান ও অভিবাসনসূত্রে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালিরা, তাদের সঙ্গে সঙ্গে ‘আ-মরি বাংলা ভাষা’। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরের সীমানা ছাড়িয়ে বাঙালিরা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে। দূরপ্রাচ্য থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে তারা পাড়ি জমিয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকায়।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে বাঙালির ভাষাগত মর্যাদা ও মননের প্রধান প্রতীকে পরিণত হওয়া শহীদ মিনারও এখন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে বাইরে। বিশেষত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন জনপদে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে শহীদ মিনার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পর সেই বিভক্তি ও বিভেদ কমতে থাকে। রাজনৈতিক সীমারেখার দু’পাশে থাকা একই ভাষার বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বাড়তে থাকে। বাঙালির প্রথম রাষ্ট্র বাংলাদেশের বাইরে থাকা বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্যও গৌরবের বিষয় হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের ঢাকায় ও আসামের শিলচরে যে দামাল তরুণরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, তারা হয়ে উঠেছেন রাষ্ট্রীয় পরিচয় নির্বিশেষে সকল বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর নায়ক। শ্রদ্ধা, শোক ও পুষ্পে পুষ্পে তারা স্মরিত হতে থাকেন বাংলাদেশের বাইরে ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদগুলোতেও। নির্মিত হয় স্থায়ী শহীদ মিনারও।
বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরে বাকি বিশ্বেও সগৌরবে মাথা উঁচু করছে বাংলা ভাষার শহীদ মিনার। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ফ্রান্সের বারি, ইতালির রোম, জাপানের টোকিও, কানাডার টরন্টো, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে তৈরি হয়েছে স্থায়ী শহীদ মিনার। যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধশতাধিক শহরসহ বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন বাঙালি অধ্যুষিত জনপদে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় অস্থায়ী শহীদ মিনার। এই সংখ্যা ইতিমধ্যে একশ’ ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
মায়ের ভাষার জন্য এভাবে জীবন বাজি রাখার ইতিহাস বাঙালি ছাড়া বিশ্বের আর কোনো জাতি তৈরি করতে পেরেছে কি-না সন্দেহ। সে কারণে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতি বিশ্বে এক অনন্য মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভাষার জন্য বাঙালির দামাল সন্তানদের সেই সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আবেগের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলেছে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ঘোষণা করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। বাঙালির একান্ত গর্ব ও শোকের ঘটনাটি কেবল বাংলা ভাষা নয়, আদায় করে বিশ্বের সব মাতৃভাষার জন্য স্বীকৃতি। যে দিবস বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরাই পালন করত, এখন তা যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রে। স্মরিত হয় বাংলা ভাষার শহীদ ও সংগ্রামীরা। আমাদের শহীদ মিনার স্থান পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সংক্রান্ত জাতিসংঘের অফিসিয়াল সাইটে। নিজের মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি বিশ্বের সব জাতি এখন মনে রাখে বাংলা ভাষাকেও।
বাংলা বর্ণমালা, শহীদ মিনার, বইমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আলোকিত ফেব্রুয়ারি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সীমানার বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী, যেন ছড়িয়ে দিয়েছে বাংলার রাঙা ফাগুনকেই।

