টানা হরতাল-অবরোধে চিংড়ি রপ্তানিতে ধস

প্রকাশিত: February 1, 2015 | সময়: 12:34 pm

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: টানা অবরোধ-হরতালে রপ্তানি করতে না পারায় দেশের চিংড়ি রপ্তানিকারকদের কারখানাগুলোতে অন্তত ১০ হাজার ৯৪০ টন রপ্তানিযোগ্য চিংড়ির মজুত জমে গেছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে এমনিতেই চিংড়ি রপ্তানি কমে গেছে। সেই অবস্থায় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এর কারণে ঠিকমতো পণ্য জাহাজীকরণ করা যাচ্ছে না। কিন্তু কারখানার খরচ ঠিকই গুণতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে রপ্তানিমুখী চিংড়িশিল্পে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ ৮-১০ কোটি টাকা। সে হিসাবে শুক্রবার পর্যন্ত টানা অবরোধ-হরতালের ২৫ দিনে এই খাতে অন্তত ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আর রাজনৈতিক অস্থিরতা এভাবে চলতে থাকলে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা তো অর্জিত হবেই না, বরং তা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা।
বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. আমিন উল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রপ্তানি কমে গেছে। উৎপাদনও কমিয়ে দিতে হয়েছে। তবু ১০ হাজার টনের মতো চিংড়ি জমে গেছে। কিন্তু কারখানার খরচ তো কমেনি। সে কারণে এই খাতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ৮-১০ কোটি টাকা।
আমিন উল্লাহ আরো জানান, বিশ্ববাজারে চিংড়ি রপ্তানি ভালো নয়। সে কারণে এমনিতেই এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮-১০ শতাংশ রপ্তানি কম হতে পারে। কিন্তু এই হরতাল-অবরোধ চলতে থাকলে বছর শেষে রপ্তানি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) দেশ থেকে ৩২ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়েছে। এটি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২.৩০ শতাংশ কম। আগের বছরের একই সময় রপ্তানি হয়েছিল ৩৩ কোটি ১৩ লাখ ডলারের চিংড়ি।
গত গোটা অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের চিংড়ি রপ্তানি হয়। চলতি বছরের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এখন শঙ্কিত রপ্তানিকারকরা।
প্রসঙ্গত, বাগদা (লোনা পানির চিংড়ি) ও গলদা জাতের চিংড়ি (মিঠা পানির চিংড়ি) দেশ থেকে বিদেশে রপ্তানি হয়। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই বাগদা।
বিশ্বব্যাপী রপ্তানি হওয়া চিংড়ির মধ্যে অন্য একটি জাত রয়েছে, যার নাম ভেনামি। বাংলাদেশে এই ভেনামি জাতের চিংড়ির চাষ হয় না। এই ভেনামি চিংড়ির দাম বাংলাদেশি বাগদার চেয়ে ইউরোপের বাজারে অনেক কম।

এদিকে, ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেল না কেনায় ডলারের বিপরীতে রুবলের বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। সে কারণে তারা বিভিন্ন পণ্যের আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে পড়ে গেছে বাংলাদেশের চিংড়িও।
বাংলাদেশ থেকে সারা বিশ্বে যত চিংড়ি রপ্তানি হয়, এর প্রায় ৫ শতাংশ যায় রাশিয়ায়। বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে রাশিয়া সে পরিমাণ চিংড়ি বাংলাদেশ থেকে আর নিচ্ছে না।
এ ছাড়া বাংলাদেশের চিংড়ির ৬৫ শতাংশই যায় ইউরোপের দেশগুলোতে। ডলারের বিপরীতে ইউরোরও দরপতন ঘটেছে। সে কারণে তারাও চিংড়ি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দায় ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ইউরোপের ক্রেতারা ভেনামি চিংড়ির দিকে ঝুঁকছেন। এক পাউন্ড বাগদার দাম ৭-৮ ডলার হলেও ভেনামি কেনা যায় ৩- ৪ ডলারে। ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে ভেনামি চিংড়ি জনপ্রিয় হচ্ছে। এর প্রভাবে বাগদা চিংড়ি রপ্তানি কমছে।
চিংড়ি রপ্তানিকারক সমিতি বলছে, দেশে প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি হয়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রপ্তানি কিছুটা কমে যায়।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে যেখানে ৪ হাজার ২৯ টন চিংড়ি রপ্তানি হয়েছিল, সেখানে এই জানুয়ারির প্রথম ২৮ দিনে হয়েছে ২ হাজার ৮৯৯ টন।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, এই রপ্তানি কমার বড় কারণ চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা। রপ্তানিপণ্য ঠিকমতো বন্দরে না পৌঁছানোয় সময়মতো জাহাজীকরণ করা যায়নি। এসব কারণেই রপ্তানি কমেছে।
রপ্তানিকারক সমিতির তথ্যে দেখা গেছে, গত জুলাইতে দেশ থেকে চিংড়ি রপ্তানি হয় ৫ হাজার ১৬ টন। আগস্টে ৪ হাজার ৬৯৮ টন, সেপ্টেম্বরে ৫ হাজার ১২ টন, অক্টোবরে ৪ হাজার ৪৩ টন। নভেম্বরে অবশ্য রপ্তানি বেশ কমে যায়, হয় ৩ হাজার ৬৯৬ টন।
আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, শুধু ডিসেম্বর ছাড়া সব মাসেই আগের বছরের চেয়ে রপ্তানি কমে গেছে।
‘মার্চ-এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চিংড়ি সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ফলে এ সময় প্রচুর পরিমাণে চিংড়ি রপ্তানি হয়। সেই সময় পর্যন্ত যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকে, তাহলে তা আমাদের জন্য অশনিসঙ্কেত।’
সর্বোপরি সমিতির কর্মকর্তাদের মতে, এমনিতেই এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮-১০ শতাংশ রপ্তানি কম হতে পারে। কিন্তু এই হরতাল-অবরোধ চলতে থাকলে বছর শেষে রপ্তানি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমার আশঙ্কা রয়েছে।