কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ॥
পাহাড়ী ঢল ও অতিবৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। নিমজ্জিত হয়েছে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার তীরবর্তী তিন শতাধিক গ্রাম, চর ও দ্বীপচর। এতে প্রায় ৪০ হাজার পরিবারের সোয়া লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহমান ১৬টি নদীর ১০টিই ভারত থেকে উৎপত্তি। ফলে উজান থেকে বয়ে আসা অতিরিক্ত পানির কারণে আকস্মিক এ বন্যার সৃষ্টি।
রোববার দুধকুমার নদীর পানির তোড়ে সোনাহাট ব্রীজের পশ্চিম প্রান্তের সংযোগ সড়কের ৫০ মিটার এলাকায় ধস দেখা দেয়ায় এ পথে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ হেেয় গেছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাফুজার রহমান বলেন, গত ২৪ ঘন্টায় ব্রক্ষপুত্রে ২ সেন্টিমিটার, তিস্তায় ১৪ সেন্টিমিটার ও দুধকুমারে ৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। ধরলায় ৬ সেন্টিমিটার পানি কমলেও এখনও বিপদসীমার কাাছাকছি অবস্থান করছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুরের ৪২টি ইউনিয়নের চলাঞ্চল ও নদ-নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার কারণে এসব এলাকার সকল গ্রামীণ সড়ক ডুবে গেছে। নৌকা ছাড়া যোগাযোগের উপায় নেই। বন্ধ হয়ে গেছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দুই শতাধিক ঘর-বাড়ি পানির তোড়ে ভেসে গেছে। টানা ৫দিন ধরে পানিবন্দী থাকায় বন্যার্ত মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। অনেকেই ঘরের ভেতর উঁচু মাচায় আশ্রয় নিলেও দেখা দিয়েছে জ¦ালানী ও খাদ্য সংকট। পাশাপাশি গো-খাদ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে।
যাত্রপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর, পাঁচগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমীর আলী, উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন, বুড়াবুড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন চাঁদ, নাগেশ^রীর বেরুবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মমিনুর রহমান জানান, বন্যার্ত মানুষ খাদ্য সহায়তার জন্য প্রতিদিন ভির করছে। কিন্তু রোববার পর্যন্ত সরকারিভাবে কোন ত্রাণ বরাদ্দ করা হয়নি। এনজিওরাও হাত গুটিয়ে বসে আছে। ফলে পরিস্থিতি ভয়াবহতার দিকে এগুচ্ছে।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডাঃ জয়নাল আবেদীন জিল্লুর জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৯ উপজেলার জন্য ৮৫টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া কন্ট্রোল রুম খুলে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালেব মোল্লা জানান, এখন পর্যন্ত উপজেলা থেকে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা পাওয়া যায়নি। তালিকা পেলেই ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হবে। এখন পর্যন্ত ৮০ মে.টন চাল ও সাড়ে ৪লাখ টাকা মজুদ আছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরী ভিত্তিতে আরো ৫০০ মে.টন চাল ও ৫ লাখ টাকা চেয়ে ফ্যাক্স বার্তা পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় এনজিও আরডিআরএসের মনিটরিং সেল সুত্রে জানা যায়, বন্যার ফলে প্লাবিত হয়েছে ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় অবস্তিত কাইজার চর, উত্তর ঢলডাঙ্গা, ইসলামপুর, বয়তুল্লার চর, পাইকডাঙ্গা, উত্তর তিলাই ও দক্ষিণ ছাট গোপালপুর। নাগেশ্বরীর ফান্দেরচর, মেছেরেরচর, চর ধড়কা, চর নুনখাওয়া, চর কৃঞ্চপুর, ব্যাপারীরচর, মাঝেরচর, চর কাফনা, পদ্মারচর, পাখিউড়ার চর, মাঝিয়ালি ও চৌদ্দকুড়ি। কুড়িগ্রাম সদরের চর হলোখানা, চর বড়াইবাড়ী, চর ভেলাকোপা, আরাজি পিপুলবাড়ি, আলোরচর, ভগবতিরচর, চর পার্ব্বতীপুর, চর রাউলিয়া, গোয়ালপুড়ি, বড়–রা, পোড়ারচর, রলাকাটা, কালির আলগা ও তিনহাজারী। উলিপুরের রলাকাটা, জলন্ধরকুটি, চর মোহাম্মদপুর, আক্কেল মামুদ, ফকিরেরচর আটা খাওয়ার চর, চর বাগুয়া, চরগুজিমারী, সাহেবের আলগা, দৈ খাওয়া, কালির আলগা, মেকুরের আলগা, গেন্দার আলগা, বাগুয়া, চর বাগুয়া, প্যাড়ার চর, সুখেরবাতি, খামারদামার, বিরহিম, সাতালস্কর, চর বজরা, চর বজরা পূর্ব, চর গোড়াই পিয়ার, রামনিয়াশা, জোয়ান সাতরা, খারিজা নাটশালা, চর রতিদেব, পূর্ব রতিদেব, চর কারপুড়া ও চর অর্জুন।চিলমারীর নটারকান্দি, উত্তর খেদাইমারী, দক্ষিণ খেদাইমারী, খেরুয়ার চর, খাউরিয়া, চর মোদাফত কালিকাপুর, নটারকান্দি, নতুনচর, খদ্দবাঁশপাতারি, সিরাজগের, মাইজবাড়ি ও বড়বাগসহ আরো অর্ধশতাধিক চর প্লাবিত হয়েছে।
এছাড়াও কয়েকটি ইউনিয়নের নিচু এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় বন্যা পরিস্থিতি মারাতœক আকার ধারণ করেছে।

