বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
রাজধানী জুড়ে অবৈধ বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি। সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি ছাড়াই রাস্তার পাশে, মোড়ে মোড়ে, ফুটওভারব্রিজের গায়ে এমনকি বিভিন্ন ভবনের ছাদেও শোভা পাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের রাজনৈতিক নেতাদের শুভেচ্ছা এবং নানান পণ্যের মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড। পরিকল্পনাহীন যত্রতত্র নির্মিত এসব বিলবোর্ডে যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সম্প্রতি সামান্য ঝড়ো বাতাসে একটি বিলবোর্ড ভেঙে রাস্তায় পড়ে। এতে তিনজন পথচারী আহতও হয়।
এসব বিলবোর্ড, ইউনিপুল, টি সাইন, মেগা সাইন, পরিচিতিমূলক ওভারহেড ও ফেস্টুনের মাধ্যমে তিলোত্তমা শহর ঢাকার সৌন্দর্য এখন একেবারেই ম্লান। আশঙ্কাজনকহারে ঝুঁকিপূর্ণ এ বিলবোর্ডের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমাতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিলবোর্ড বসিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে এমন অভিযোগও রয়েছে। নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য যেসব ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোও নানান ব্যানার ও বিলবোর্ডে ঢেকে ফেলা হয়েছে।
ফলে এসব ফুটওভারব্রিজ মাদকসেবীদের আস্তানা এবং ভাসমান মানুষের মলমূত্র ত্যাগের স্থানে পরিণত হয়েছে। এসব কারণে দিনের বেলায়ও সাধারণ মানুষর ফুটওভারব্রিজে রাস্তা পারাপারে ভয় পায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল ইনকিলাবকে বলেন, রাজধানী জুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ডের বিষয়টি মাথায় রেখেই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় মেয়রের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল ঢাকাকে বিলবোর্ড মুক্ত করা হবে। মেয়র তার ঘোষিত ‘ক্লিন ঢাকা’ কর্মসূচির বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাও করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ডিএসসিসি থেকে নতুন কোন প্রকার বিলবোর্ডের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না। পুরাতন কোন বিলবোর্ডের অনুমোদন নবায়ন করা হচ্ছে না। মোস্তফা কামাল বলেন, অনুমোদিত বিলবোর্ড থেকে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে দক্ষিণ সিটির রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্র ছিল পাঁচ কোটি ১১ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ১৮৮ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে এ খাতে ছয় কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের টার্গেট দেয়া হয়েছে। তবে ক্লিন ঢাকা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে চলতি অর্থ বছরের রাজস্ব আদায়ের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ও বিলবোর্ড শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপন কুমার সাহা ইনকিলাবকে বলেন, ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে আমাদের টার্গেট ছিল ১০ কোটি। আমরা আদায় করেছি নয় কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে টার্গেট দেয়া হয়েছে ১৬ কোটি টাকা। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মতো এখানেও একই অবস্থা।
বর্তমান বছরের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ কোটি টাকা আদায় নিয়েও তিনি শঙ্কিত। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পৃথক হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে মোট বৈধ বিলবোর্ড, ইউনিপুল, টি সাইন, মেগা সাইন, পরিচিতিমূলক ওভারহেড, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারের সংখ্যা দুই হাজার ৬০৮টি। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে রয়েছে ৬৯৭টি। আর উত্তর সিটি কর্পোরেশনে রয়েছে এক হাজার ৯১১টি। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অবৈধ বিলবোর্ড রয়েছে দুই হাজার ৫৩টি। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অবৈধ বিলবোর্ড রয়েছে ৭০৩টি আর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের রয়েছে এক হাজার ৩৫০টি। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বৈধ বিলবোর্ডের মধ্যে রয়েছে বিলবোর্ড ৩১৬টি, মেগা সাইন ৩৬৫টি ও পরিচিতিমূলক ওভারহেড ১৬টি। অবৈধ বিলবোর্ডের মধ্যে কর বহির্ভূত ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় ৪০৮টি বিলবোর্ড রয়েছে। ইউনিপুল ১৭৬টি ও বিলবোর্ড ১১৯টি।উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কাছে বিলবোর্ড, ইউনিপুল, টি সাইন, মেগা সাইন, পরিচিতিমূলক ওভারহেড, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারের আলাদা হিসাব পাওয়া যায়নি। বৈধ এসব বিলবোর্ডের বাইরে রাজধানীতে আরও ১৮ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন আকৃতির বিলবোর্ড রয়েছে।
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে বৈধ বা অবৈধভাবে বিলবোর্ড স্থাপনের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কোনো নীতিমালা। অবশ্য বিলবোর্ড স্থাপনে কাঠামোগত কোনো নীতিমালা না থাকায় যে যেভাবে পারছে যেখানে-সেখানে বিলবোর্ড স্থাপন করছে। আর এসব বিলবোর্ড রাজধানীর সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি বিভিন্ন ভবনকে ভূমিকম্পসহ নানা দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে ফেলছে। একেকটা বিলবোর্ড পরিণত হয়েছে মৃত্যু ফাঁদে।সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র বিলবোর্ড আর দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিলবোর্ড আজকে বাংলাদেশে একটা নতুন দুর্ভোগ। আমি মনে করি এটা নতুন একটা বিরক্তি, এই বিলবোর্ড ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে। নেতার সঙ্গে পাতিনেতা, উপনেতা, সিকিনেতাদের বিভিন্ন বিলবোর্ডে ছবি দেখা যায়। এর মধ্যে অনেক চাঁদাবাজদেরও দেখা যায়।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন গত ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বিলবোর্ড, ইউনিপুল, টি সাইন, মেগা সাইন, পরিচিতিমূলক ওভারহেড, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার থেকে ১৪ কোটি ৯০ লাখ ৭ হাজার ১৮৮ টাকা রাজস্ব আয় করেছে। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি আয় করেছে পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ১৮৮ টাকা। উত্তর সিটি কর্পোরেশন আয় করেছে নয় কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এক হিসেবে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের সব বিলবোর্ড যদি সিটি কর্পোরেশনের রাজস্বের আওতায় আনা যেত তাহলে এ হিসাব ১০০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াতো। অবৈধ বিলবোর্ডের কারণে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। অনুমোদন না থাকায় মোটা অংকের টাকা কোষাগারে যোগ হচ্ছে না। রাজধানীতে বৈধের চেয়ে অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা দিন দিন বেডেই চলেছে। ইতোমধ্যে দুই সিটি কর্পোরেশনেই অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। তবে অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদের জন্য দুই সিটি কর্পোরেশনে রয়েছে মাত্র একটি ক্রেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও লোকবলের অভাবে উচ্ছেদ অভিযানে ধীরগতি চলছে বলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান।
অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ অভিযান পর্যবেক্ষণে এসে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, আমরা আর্মি, নেভি, সিভিল এভিয়েশন, এয়ারফোর্স, রেলওয়ে, রাজউক, রোডস এন্ড হাইওয়ে সবাই মিলে চেষ্টা করব অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ করার জন্য। তিনি বলেন, আমরা চাই অবৈধ বিলবোর্ড কোথাও না থাকুক। আমরা বিলবোর্ড অ্যাসোসিয়েশনের সাথে কথা বলেছি তারা সরাবে বলে কথা দিয়েছেন। কিন্তু আমরা সে উদ্যোগ দেখছি না। সেজন্য আমরাই এখন অবৈধ বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলছি। তিনি বলেন, আমরা চাই যারা এ ব্যবসা করে তারা আমাদের সহযোগিতা করুক। যেন আমরা পরস্পরকে ভাল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারি।সামনে মুসলমানদের কোরবানির ঈদ ও হিন্দুদের দুর্গাপূজা। এ দুটি উৎসবকে কেন্দ্র করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদ্বয়কে শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার, বিলবোর্ড, ফেস্টুন টানানোর হিড়িক শুরু হয়ে গেছে রাজপথ ও অলিগলিতে।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উপ-রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার ইনকিলাবকে বলেন, ডিএসসিসির মেয়র সঈদ খোকন ঈদুল ফিতরের আগেই এক জরুরি সভার মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছেন তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যে সমস্ত ব্যানার, বিলবোর্ড ও ফেস্টুর সাটানো হয়েছে সেগুলো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলার জন্য। তিনি বলেন, মেয়র মহোদয়ের নির্দেশ অনুযায়ী এ ঈদেও যদি ওই ধরনের বিলবোর্ড, ফেস্টুন ব্যানার সাটানো হয় সেগুলোও উচ্ছেদ করা হবে। শুধু তাই নয় অবৈধ ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড উচ্ছেদের কাজ এখনো অব্যাহত রয়েছে।সরকার দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী মহল বৈধ ও অবৈধ বিলবোর্ড দখল করে দোয়া ও শুভেচ্ছা জানানোর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনছার আলী খান ইনকিলাবকে বলেন, কেউ তো আমাদের কাছে বাদী হচ্ছে না আমরা কোন সূত্র ধরে ব্যবস্থা নিব। সরকার দলীয় নেতাকর্মী কিংবা এমপি-মন্ত্রী যদি এসব দখল করে শুভেচ্ছা ও দোয়া চেয়ে ব্যবহার করে তাহলে ঐ ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হওয়ার সাহস কার আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই।ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নথিপত্রে বিলবোর্ডের যে হিসাব রয়েছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার পার্থক্য অনেকটা রাত-দিন।
নানা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা নগরীতে বিভিন্ন আকৃতির বিলবোর্ডের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এসব বিলবোর্ডকে ঘিরে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য চলে। বিশাল এই বাণিজ্যের ভাগ চলে যায় প্রভাবশালী নানা মহলের পকেটে। অথচ রাজধানীতে দুই সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদনপপ্রাপ্ত বিলবোর্ডের সংখ্যা সব মিলিয়ে মাত্র আড়াই হাজার। ডিসিসি সূত্রে জানা যায়, প্রচলিত আইন মতে, কর্পোরেশনের জায়গায় অথবা যে কোন ধরনের সরকারি-বেসরকারি জায়গায় বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ড অথবা সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হলে নির্ধারিত ফি দিয়ে সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন নিতে হয়। এরপর স্থাপিত বিলবোর্ড বা বিজ্ঞাপন বোর্ডের বিপরীতে প্রতিবছর কর্পোরেশনকে নির্ধারিত হারে কর দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে এ আইনের প্রয়োগ খুবই সামান্য।
যে কারণে বৈধ বিলবোর্ডের চেয়ে অবৈধ বিলবোর্ডের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ বিলবোর্ড বৈধ কাঠামোর আওতায় না আসার কারণে বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। অভিযোগ রয়েছে, দুই সিটি কর্পোরেশনের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী বছরের পর বছর অবৈধ বিলবোর্ডের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সংবাদ২৪.নেট ডেস্ক

