বাংলাভূমি ডেস্ক ॥
ঢাকা: প্রায় দুই বছর পর রাজধানীর গোপীবাগের চাঞ্চল্যকর ছয় খুনের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) ছয় সদস্য মিলে এই খুনের ঘটনাটি ঘটায়।
শুক্রবার জেএমবি সদস্য তারিকুল ইসলাম মিঠু ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। আদালতে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে বিস্তারিত জানিয়েছেন।
নিহত লুৎফর রহমান ফারুক ছিলেন কথিত পীর। ধর্মীয় মতবাদের বিরোধের কারণেই ফারুক ও তার পাঁচ অনুসারীকে গলাকেটে হত্যা করে জেএমবি সদস্যরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছয় খুনের মতোই একইভাবে গত বছর রাজধানীর রাজাবাজারে হত্যার শিকার হয়েছেন ইসলামি বক্তা মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী। পিডিবির চেয়ারম্যান খিজির খান ও ছয় খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের পর ফারুকী হত্যার রহস্যও বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুক্রবার বিকেলে ছয় খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক কাজী গোলাম কবীর আসামি তারিকুল ইসলাম মিঠুকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করেন। এর আগে গত ১৭ নভেম্বর আদালত মিঠুর রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ঢাকার মহানগর হাকিম মাহবুবুর রহমান শুক্রবার মিঠুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এর আগে গত ২৫ অক্টোবর মিঠু আদালতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খিজির খান হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন।
জানতে চাইলে ছয় খুনের তদন্ত কর্মকর্তা, ডিবির পরিদর্শক কাজী গোলাম কবীর বলেন, ‘শুক্রবার তারিকুল ইসলাম মিঠু আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এরপর আদালতের নির্দেশে তাকে জেল-হাজতে পাঠানো হয়েছে।’
সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে মিঠু ছয় খুনে ছয় জেএমবি সদস্য সরাসরি অংশ নিয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, ‘লুৎফর রহমান ফারুক নিজেকে ইমাম মেহেদীর সেনাপতি দাবি করে নিজস্ব তরিকা তৈরি করেন। তিনি মুরিদও তৈরি করেছিলেন। এ কারণে জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ফারুককে হত্যার পরিকল্পনা করেন।’
তিনি বলেন, সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তারিকুল ইসলাম মিঠুসহ ছয়জন সরাসরি হত্যায় অংশ নেয়। তারা প্রথমে গোপীবাগে ফারুকের বাসায় ভক্ত সেজে প্রবেশ করে। পরে বাকবিতণ্ডা শুরু করে। এক পর্যায় বাসার লোকজনকে জিম্মি করে ফারুক ও তার পাঁচ অনুসারীকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পীর ও মাজারের অনুসারী হওয়ার কারণেই ফরুকসহ ছয়জনকে খুন করা হয় বলে দাবি করেছেন তারিকুল ইসলাম মিঠু।
২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ৬৪/৬ নম্বর চারতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার বাসায় মুরিদ সেজে ঢুকে কথিত পীর লুৎফর রহমান ফারুক, তার ছেলে সারোয়ার ইসলাম ফারুক ওরফে মনির, খাদেম- মঞ্জুর আলম মঞ্জু, মুরিদ- শাহিন, রাসেল ও মুজিবুল সরকারকে জবাই করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পরদিন নিহত লুৎফর রহমানের ছোট ছেলে আবদুল্লাহ আল ফারুক অজ্ঞাত ১০/১২ জনকে আসামি করে ওয়ারি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। থানা থেকে মামলার তদন্তভার ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে দীর্ঘদিনের তদন্তে জেএমবির জঙ্গিদের সন্দেহের মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে রহস্য।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তুরাগ থেকে জেএমবির একাংশের ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল্লাহ আল তাসনীম ওরফে নাহিদসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জেএমবির পীর ও মাজারের অনুসারীদের হত্যার পরিকল্পনার তথ্য পায় গোয়েন্দারা। এরপর গোপীবাগের ছয় খুন ও রাজাবাজারে মাওলানা ফারুকী খুনের ঘটনায় জেএমবির জড়িত থাকার সন্দেহ করে তদন্তকারীরা।
গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে তিন জঙ্গী ছিনতাইয়ের মামলায় গ্রেপ্তার আজমীর অমিত, গোলাম সরোয়ার রাহাত, জিয়াউল ইসলাম জিতু ও আল আমীন জেল হাজতে ছিলেন। এ চার জঙ্গীকে ছয় খুনের মামলায় শোন অ্যারেস্ট করে দুই দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি। তখন রহস্যের কিনারা হয়নি।এই আসামিরা অন্য মামলায় কারাভোগ করলেও ছয় খুনের মামলায় জামিন পেয়েছেন।
এদিকে গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় নিজের খানকাহ শরীফে গলাকেটে হত্যা করা হয় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও পীর খিজির খানকে। এই ঘটনার তদন্তে নেমেও ভিন্ন মতাদর্শীদের জড়িত থাকার তথ্য পান গোয়েন্দারা। গত ১৪ অক্টোবর টাঙ্গাইল থেকে জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য তারিকুল ইসলাম মিঠুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৫ অক্টোবর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয় মিঠু। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের মধ্যে সুমন নামে আরেক আসামি আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। আসামিরা জানিয়েছে, জেএমবির একটি অংশের নেতাদের নির্দেশে প্রায় দুই বছর ধরে পীর ও মাজারের অনুসারীসহ ভিন্ন মতাদীর্শদের হত্যার মিশন নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে। খিজির খানকে হত্যার সময় মিঠু অংশ নেয়। নেতৃত্ব দেন জেএমবি কমান্ডার মাহফুজ।
গত বুধবার রাতে রাজধানীর দারুসসালাম এলাকায় ডিবির সঙ্গে বন্দুকযদ্ধে মাহফুজ নিহত হয়েছেন। সে আশুলিয়ার বড়ৈপাড়ায় পুলিশ সদস্য মুকুল হত্যা, হোসেনী দালানে বোমা হামলা এবং আশুলিয়ায় কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি ও আটজনকে খুনের ঘটনার মূল হোতা ছিল বলে দাবি করছে ডিবি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৯ অক্টোবর গাবতলীতে পুলিশ কর্মকর্তা ইব্রাহিম হত্যার পর মাসুদ রানা ওরফে সুমনকে গ্রেপ্তার করে জামায়াত-শিবির ও জেএমবির যোগসাজসে নাশকতার অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এর সূত্র ধরে হোসনি দালানে হামলায় জড়িত পাঁচ জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাহফুজকে গ্রেপ্তারের অভিযান চালানো হয়েছে। এর আগে ১১ জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে মিঠুকে গ্রেপ্তারের পর খিজির খান খুনের রহস্য বেরিয়ে আসে।
সূত্রমতে, মিঠু ও মাহফুজ জেএমবির বেশ কয়েকটি নাশকতায় জড়িত ছিল, এমন তথ্য পেয়েই তদন্ত এগিয়ে গেছে। মিঠু ২০০৫ সালে সারা দেশে একযোগে বোমা হামলার ঘটনায় চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এরপর দুবছর আগে জামিনে ছাড়া পান তিনি। মাহফুজ শেরপুরের নকলা উপজেলার মৃত মজিবুর রহমানের ছেলে। তবে জামিনে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যান তিনি। এরপর কিলিং মিশনে নামেন। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, এই চক্রটিই গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের ১৭৪ নম্বর বাড়ির ভাড়া বাসায় হজ্বে যাওয়ার ব্যাপারে আলাপ করার ছলে ঢুকে শায়খ মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকীকে হত্যা করে। ফারুকী ছিলেন টেলিভিশনে ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও ইসলামী ফ্রন্টের নেতা।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমরা আগেই তথ্য পেয়েছি জেএমবিরই কোনো গ্রুপ দুই খুনে জড়িত। আশা করছি খুব শিগগিরই এর রহস্য বেরিয়ে আসবে।’

