বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠিন পরীক্ষা আজ। ইইউর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আজকের সার্বিক পর্যালোচনা বৈঠকের ওপরেই মূলত নির্ভর করছে রফতানি সুবিধার বিষয়টি। রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর ২০১৩ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় বাজারে তৈরি পোশাকের পণ্য রফতানি বহাল রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ‘সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্ট’ নামের একটি চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। তার সঙ্গে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও আইএলও। বুধবার এতে যোগ দেয় কানাডা।
ওই চুক্তিতে শর্ত ছিল যে, ইউরোপীয় বাজারে তৈরি পোশাকের পণ্য শূন্য শুল্কে রফতানি বহাল রাখতে হলে এই শিল্পের শ্রমমান ও কারখানা ভবনের নিরাপত্তার ব্যাপক উন্নতি করতে হবে। চুক্তিটির দ্বিতীয় পর্যালোচনা বৈঠক আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ বৈঠকের ওপরই অনেকখানি নির্ভর করছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ।
বৈঠক নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের প্রস্তুতির বিষয়ে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর দফতরে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, শ্রম সচিব মিকাইল শিপার ও পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক উপস্থিত ছিলেন। রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর থেকে পোশাক শিল্পের অগ্রগতি মনিটর এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে লিয়াজোঁর দায়িত্ব পালন করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, শ্রম সচিব ও পররাষ্ট্র সচিব। দায়িত্বপ্রাপ্ত এই তিন সচিব আজকের বৈঠকে পৃথক ৩টি অধিবেশন পরিচালনা করবেন। দুপুর আড়াইটায় গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে এ বৈঠক শুরু হবে এবং সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ বৈঠক শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অপরদিকে পোশাক শিল্পের অগ্রগতি যাচাই করতে ব্রাসেলস থেকে আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তিসংক্রান্ত পরিচালক সান্দ্রা গালিনার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল, ওয়াশিংটন থেকে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) সদর দফতর জেনেভা ও আঞ্চলিক দফতর ব্যাংকক থেকে একটি প্রতিনিধিদল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কতটা অগ্রগতি সাধন করতে পেরেছে তা নির্ধারণের ওপর শুধু ইইউ বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকা নয়; বরং শিগগিরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবে কিনা সেটিও নির্ভরশীল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) স্কিমের আওতায় অস্ত্র ছাড়া সব পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করে থাকে। রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর বাংলাদেশের সঙ্গে এ চুক্তি বাতিল করার চিন্তা করেছিল ইইউ। তারপর ইউরোপীয় গোষ্ঠীর শর্ত মেনে বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুত দিলে ইইউ ওই অবস্থান থেকে সরে আসে।
তারপর ২০১৪ সালে ব্রাসেলসে সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্টের প্রথম পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক শেষে ইইউ জানায় যে, বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের মানোন্নয়নে যথেষ্ঠ অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে এ কাজে আরও অনেক কিছু করার বাকি আছে।
জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বুধবার বলেন, কম্প্যাক্ট বাস্তবায়নে আমাদের দিক থেকে যতটুকু করার আমরা সবই করেছি। আমরা কম্প্যাক্টের চাহিদা মোতাবেক ১০০ ভাগের কাছাকাছি কমপ্লায়েন্স (করণীয় শর্ত) পূরণ করেছি। আমরা আশা করি, আমাদের দিকটা ইইউ বিবেচনা করবে। বড় শর্তের সবই করেছি। কিছু কিছু ছোটখাটো বিষয় থাকে যা সব দেশেই রাতারাতি পালন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এগুলোর জন্য আমরা অবশ্যই সময় চাইব।
পোশাক শিল্পের উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, আমরা অনেক পরিদর্শক নিয়োগ দিয়েছি। অনেক কারখানা পরিদর্শন করেছি। কারখানাগুলোর গঠন কাঠামো, দুর্বলতা, আইন সবকিছু ওয়েবসাইটে দিয়ে দিয়েছি, যা কোনো দেশে করা হয় না। আমাদের দেশে অনেক কারখানা আছে যেগুলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কাজ করছে। তিনি দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেন যে, পর্যালোচনা বৈঠক থেকে একটা ভালো ফল বেরিয়ে আসবে। বৈঠকটি ফলপ্রসূ হবে।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় প্রায় ১১শ’ মানুষ যাদের বেশিরভাগ গার্মেন্টকর্মী নিহত হওয়ার পর ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে বাংলাদেশকে ১৬ দফা শর্ত দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ বলছে, এসব শর্তের সবই পূরণ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ভবন নিরাপত্তায় অগ্রগতি হলেও শ্রমিক ইউনিয়নের অবারিত সুযোগ ও রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তোলার সুযোগ এখনও সৃষ্টি হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এটিও বলা হয় যে, ইইউ সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্ট পর্যালোচনা শেষে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেয়া হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ওয়াশিংটন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পোশাক শিল্পের উন্নয়নে পৃথক চুক্তি করার পর বাংলাদেশ গার্মেন্ট কারখানা পরিদর্শনে অনেক পরিদর্শক নিয়োগ দিয়েছে। সমন্বিত উপায়ে পোশাক কারখানা পরিদর্শন করে যেসব কারখানায় মান উন্নত হয়নি তার অনেকগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র এখনও অভিযোগ করে আসছে যে, শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করতে হবে এবং রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে শ্রমিক ইউনিয়ন করার সুবিধা উন্মুক্ত করতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সর্ববৃহৎ বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইইউর বাজারে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ। এই বিপুল পরিমাণ রফতানিতে প্রধান সহায়ক জিএসপি সুবিধা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি পর্যালোচনা সভায় থাকছেন : ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল জে ডিলেনি ‘সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্ট’ দ্বিতীয় পর্যালোচনা সভায় অংশগ্রহণের জন্য ২৭ থেকে ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। তার সফরসঙ্গী থাকবেন আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি সারা ফক্স; গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শ্রমবিষয়ক অফিস পরিচালক মাইকেল ও ডোনোভান, ব্রুস লেভিন এবং এরিক রিয়েল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকার, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে যা ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ও নিটওয়্যার শিল্পের শ্রমিক অধিকার ও কারখানা নিরাপত্তার ক্রমাগত উন্নয়নের জন্য একটি কম্প্যাক্ট’ নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে যেন কম্প্যাক্টের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রমিকদের শ্রম, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং যেন দেশের পোশাক খাতে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালিত হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দ্বিতীয় পর্যালোচনা সভার জন্য প্রতিনিধিদলটি ইইউ, আইএলও এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগ দেবে যার আয়োজন করতে যাচ্ছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। যেখানে সবার লক্ষ্য থাকবে অগ্রগতির অর্জনগুলোকে নিয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে আলোকপাত করা। একই সঙ্গে এটি সব কম্প্যাক্ট অংশীদারকে একত্র করবে এবং আগ্রহী অংশীদারদের জন্য বিভিন্ন আলোচনা সভার আয়োজন করবে। প্রতিনিধিদলটি একটি ফলপ্রসূ সভার আশা করছে যেখানে সব পক্ষ একত্র হয়ে সভাটিকে সার্থক করে তুলবে।
কম্প্যাক্টে যোগ দিল কানাডা : ঢাকায় কানাডীয় হাইকমিশন বুধবার এক বিবৃতিতে সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্টে যোগদানের কথা ঘোষণা করেছে। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ, ইইউ, আইএলও এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্ট অনুমোদন করে। কানাডার হাইকমিশনার বেনোয়েট পিয়ারে লাঘামে বলেছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সংস্কারের গর্বিত সমর্থক কানাডা। কানাডীয়রা বাংলাদেশে তৈরি পোশাক পরিধান করে থাকেন। তারা নিশ্চিত হতে চান যে, এসব পোশাক সুষ্ঠু ও নিরাপদ কর্মপরিবেশে তৈরি হয়। এ লক্ষ্যেই কানাডা সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্টে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
-যুগান্তর

