শনিবার এস এম সুলতানের ৮৯তম জন্ম বার্ষিকী

প্রকাশিত: August 12, 2013 | সময়: 7:45 pm

জেলা প্রতিনিধি ॥
নড়াইল: নড়াইলে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে। শনিবার বেলা সাড়ে ১০টায় জেলা প্রশাসন ও এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন দিবসটি উদযাপন করে। নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় শিল্পীর মাজারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে কর্মসূচির সূত্রপাত হয়।

এসময় নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাওলাদার মো. রকিবুল বারী, এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মিকু, এস এম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ অশোক কুমার শীল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিমানেশ বিশ্বাস, চিত্রশিল্পী বলদেব অধিকারীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ঈদুল ফিতরের কারণে শিল্পী সুলতানের জন্মদিনের আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান ২৯, ৩০ আগষ্ট ও ১ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনাসভা ও সুলতান উৎসব।

১৯২৪ সালের ১০ আগষ্ট তৎকালীন মহকুমা শহর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শিল্পী এস এম সুলতান। সুলতানের পিতা মো. মেছের আলি মাতা মোছা. মাজু বিবি সন্তানের আদর করে তার নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া।

সুলতানের ৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে তিনি তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতী মানুষের সাথে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেছেন- পাট কাটা, ধানকাটা, ধান ঝাড়া, জলকে চলা, চর দখল, গ্রামের খাল, মৎস শিকার, গ্রামের দুপুর, নদী পারা পাড়, ধান মাড়াই, জমি কর্ষণে যাত্রা, মাছ ধরা, নদীর ঘাটে, ধান ভানা, গুন টানা, ফসল কাটার ক্ষণে, শরতের গ্রামীণ জীবন, শাপলা তোলা’র মতো বিখ্যাত সব ছবি।

১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবি সমকালীন বিশ্ববিখ্যাত চিত্র শিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পলক্লি, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। সুলতানই একমাত্র এশিয়ান শিল্পী যার ছবি এসব শিল্পীদের ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছে।

কালোত্তীর্ণ এই চিত্রশিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্স আর্টিস্ট স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন।

লাল মিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯২৮ সালে রূপগঞ্জ আশ্রম স্কুলে ভর্তির মাধ্যমে। ১৯৩৩ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যয়ের পুত্র শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্কুল পরিদর্শনে আসেন। এ সময় লাল মিয়া তার একটি সুন্দর ছবি আঁকলে তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়সহ সকলে মুগ্ধ হন। শুরু হয় শিল্পী লালের রং তুলি হাতে নতুন জীবন।

শিল্পী হওয়ার মনোবাসনায় লাল মিয়া পাড়ি জমান কলকাতার উদ্দেশ্যে। কলকাতার কাশিপুরে নড়াইলের জমিদার বাড়িতে থেকে জমিদার পুত্র অরুণ রায়ের সহযোগিতায় কলকাতার আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায় ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন সুলতান। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দ্দীর হস্তক্ষেপে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। সোহরাওয়ার্দ্দী তার অমায়িক আচরণে মুগ্ধ হয়ে লাল মিয়াকে তার বাসায় থাকার সুযোগ করে দেন। এ সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দ্দীর মাতা তার নাম রাখেন শেখ মো. সুলতান।

১৯৪৩ সালে সুলতান খাকসার আন্দোলন নামে একটি সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই ১৯৪৪ সালে তিনি ভারত ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়েন। কাশ্মীরের পাহাড়ে কিছুদিন একদল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাস করেন। ১৯৪৬ সালে কাশ্মীর থেকে চলে যান সিমলায়, সেখানে তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। এই প্রদশর্নী তার শিল্পী জীবনের প্রথম স্বীকৃতি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ও পরে করাচিতে অবস্থান করেন। এসময় নাগী, চুগতাই, শাকে আলী, শেখ আহম্মেদসহ অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে।

ইউরোপ ও আমেরিকা জয় করে মহান এই শিল্পী ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রাবাসে অবস্থান করে ফিরে আসেন মাতৃভূমি নড়াইলে। ১৯৫৫ সালে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাচুড়ি-পুরুলিয়ায় নন্দন কানন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

শিল্পী সুলতান ১৯৫৬ সালে কবি জসিম উদ্দিনের সাথে কয়েকদিন আবস্থান করেন। শিল্পী ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত যশোরের নীলগঞ্জ শশ্মানে মাঝেমাঝে ধ্যান করতেন। ১৯৬০ সালে যশোরের চাঁচড়ার জমিদার বাড়িতে কিছু কাল অবস্থান করেন। ১৯৬৫ সালে সবার অগোচরে পুনরায় পশ্চিম পাকিস্তানে গমন করেন। হারিয়ে যাওয়া লাল মিয়াকে ১৯৬৭ সালে নড়াইলের অদূরে এক গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়।

যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধূরী তাকে যশোর নিয়ে আসেন। ১৯৬৮ সালে যশোর-খুলনা ক্লাবে তার একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধূরীর উদ্যোগে ১৯৬৯ সালের ১০ই জুলাই সুলতানের মাছিমদিয়ার বাড়িতে দি ইনস্টিটিউট অফ ফাইন আটর্স উদ্বোধন করেন।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিল্পী জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে যুদ্ধের ছবি আঁকেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিল্পী নিজ শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। সে সময় প্রতিদিন রাতে একটা ঝোলা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তিনি রাত্রিযাপন করেছেন শহরের বিভিন্ন বাড়িতে। এ সময় তার সঙ্গে থাকতো আড়বাঁশি, আর কয়েকটি পোষা বেজি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সুলতান কাছ থেকে দেখেছেন এদেশের মানুষ, প্রকৃতি, মানুষের জীবনাচার। আর নিজের বোধ ও মেধাকে শাণিত করেছেন আবেগ, অনুভূতি ও উপলদ্ধির প্রয়াসে।

১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমীতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মূলত, এই প্রদশর্নীর মাধ্যমে এ দেশের সুশীল সমাজে তার নতুন ভাবে পরিচয় ঘটে।

নিহার বালা নামে এক মহিয়সী নারী শিল্পী সুলতানের পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। পিতৃতুল্য শিল্পীকে তিনি আগলে রেখেছিলেন মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত। সুলতান নিজের সঞ্চিত অর্থে শহরের মাছিমদিয়া এলাকায় চিত্রা নদীর পাড়ে নিজ বাড়িতে শিশুস্বর্গ নির্মাণ কাজে হাত দেন। নির্মাণ করেন ভাসমান শিশুস্বর্গ নামের একটি নৌকা। শিল্পীর ইচ্ছা ছিল এই নৌকায় করে কোমলমতি শিশুদের সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতি দেখবেন। শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হবেন। প্রকৃতির ছবি আঁকবেন। কিন্তু তার সেই সাধ পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শিল্পী সুলতান মৃত্যুবরণ করেন।