বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: সারাদেশে বছরে আড়াই হাজার অগ্নিকাণ্ড ঘটে জ্বলন্ত সিগারেটের গোড়া থেকে। আর ছোটদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে বছরে ঘটে যায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ’শটি ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ড।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী বিগত চার বছরে জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরায় সবচেয়ে বেশি আগুনের ঘটনা ঘটেছে ২০১৪ সালে দুই হাজার আট’শ ১৯টি। ২০১৩ সালে যা ছিলো দুই হাজার ছয়’শ ৬০টি এবং ২০১২ সালে দুই হাজার পাঁচ’শ ৩৬টি। সবশেষ হিসেবে ২০১৫ সালে জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার পাঁচ’শ ৩২টি।
আর স্রেফ সিগারেটের ফেলে রাখা গোড়া থেকে সৃষ্ট এসব আগুনে ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ২৬ লাখ ৮১ হাজার নয়’শ ৫০ টাকা মূল্যের সম্পদ।
সবশেষ এ বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার পোস্তারপাড় এলাকায় আগুনে দগ্ধ হয়ে ৫২টি ছাগল প্রাণ হারায়। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও দগ্ধ হয়ে ছাগলগুলো ঘরের ভেতরেই মারা যায়। এতে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ফায়ার সার্ভিস তখন নিশ্চিত করে বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত অংশ থেকেই ছিলো আগুনের সূত্রপাত।
দেশে যে ধূমপান বিরোধী আইন করা হয়েছে তার অন্যতম কারণ এই অগ্নিকাণ্ড। কিন্তু অনেকেই সে আইন মানছে না। আর সে কারণেই বছর শেষে এত বড় পরিসংখ্যান। এ কথা বললেন, ধূমপান বিরোধী সংগঠন মানসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী।
তিনি বলেন, সিগারেটের ধোঁয়াতে মানুষ পরোক্ষভাবে আক্রন্ত হচ্ছে। এরপর শপিংমল, অফিস-আদালত, লঞ্চ-স্টিমার ঘাট, হাসপাতাল, শিল্প এলাকায় জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরা ছুড়ে ফেলে সবাই, ওখান থেকে আগুনের ঘটনা ঘটে। অনেকে আছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ধূমপান করে। তাদের আঙ্গুলের ফাঁকে ধরে থাকা আগুনেই ঘর পুরে ছাই হয়, এমন ঘটনাও কম নয়।
‘ধূমপানের এই সকল বিলাসিতার কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। আর এর ফলে বছরে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, বলেন ড. অরূপ রতন।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, ছোটদের আগুন নিয়ে খেলার কারণে ২০১৫ সালে পাঁচ’শ ২৬টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে সারা দেশে। যার ফলে অর্থিক ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ৯২ লাখ ৩১ হাজার তিন’শ ৭০ টাকার।
একই কারণে ২০১৪ সালে অগ্নিকাণ্ড ঘটে পাঁচ’শ ৫টি; ২০১৩ সালে চার’শ ৮৯টি; ২০১২ সালে চার’শ ৩১টি। তবে এ ধরনের ঘটনা শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি ঘটে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস।
গত চার বছরের পরিসংখ্যাণ বিশ্লেষণে অবশ্য দেশে আগুনের ঘটনা কমে এসেছে। সবচেয়ে কম অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ২০১৫ সালে ১৭ হাজার চার’শ ৮৮টি। এর ফলে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮৫৬ কোটি ৯৫ লাখ ২৯ হাজার তিন’শ ৮৬ টাকা।
সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে ২০১৪ সালে ১৭ হাজার আট’শ ৩০টি। এছাড়া ২০১৩ সালে ১৭ হাজার নয়’শ ১২টি এবং ২০১২ সালে আগুনের ঘটনা ঘটে ১৭ হাজার পাঁচ’শ ৪টি।
হাংগামা বা জনতার তাণ্ডবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অগ্নিকাণ্ড সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ২০১৩ সালে। এই বছর এক হাজার তিন’শ ৪৫টি আগুনের ঘটনা ঘটে যার অধিকাংশই মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে লাগিয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সালে এমন আগুনের ঘটনা ছিলো নয়’শ ৬৩টি।
আর বৈদ্যুতিক গোলযোগে সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। অহরহই এই খবর শোনা যায়। ২০১৫ ও ২০১৪ সালে প্রায় ছয় হাজার করে এমন দুর্ঘটনা ঘটছে বলে নথিভুক্ত হয়েছে ফায়ার সার্ভিস দফতরে।
২০১৫ সালে চুলার আগুন থেকে ছোট-বড় অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে তিন হাজার তিন’শ ৬৬টি। এছাড়া অজ্ঞাত কারণে নয়’শ ৬০টি; উত্তপ্ত ছাই বা জ্বালানি থেকে ছয়’শ ৬টি; যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ জনিত কারণে দুই’শ ৪৪টি; খোলা বাতির ব্যবহারে এক হাজার ৮৩টি; মাত্রাতিরিক্ত তাপ সৃষ্টিতে এক’শ ২৩টি; মিস ফায়ার থেকে পাঁচ’শ ৯২টি; স্বতস্ফুর্ত প্রজ্বলন ৪৪টি; চিমনি হতে জ্বলন্ত স্ফুলিংগ উৎক্ষেপণ ৩৮টি; স্থির বিদ্যুতের কারণে ৭৯টি, রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় ৩৩টি; বাজী পোড়ানোর সময় ৭১টি আগুনের ঘটনা রয়েছে। বন জঙ্গলে আগুন লেগেছে ৪৫টি; জাহাজে ২০টি; আর উড়োজাহাজেও অন্তত ২ টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এই বছরে।
২০১৪ সালে চুলার আগুন থেকে চার হাজারটি অগ্নিকাণ্ড ঘটে এছাড়া; অজ্ঞাত কারণে আট’শ ৬৬টি; উত্তপ্ত ছাই বা জ্বালানি থেকে সাত’শ ৫২টি; যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ জনিত কারণে দুই’শ ৫২টি; অগ্নি সংযোগ জনিত দুই’শ ৩টি; খোলা বাতির ব্যবহারে পাঁচ’শ ৪০টিসহ অন্য বিভিন্ন কারণে এক হাজার ৪টি আগুনের ঘটনা ঘটে।
২০১৩ সালে পরিসংখ্যানে চুলার আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ড তিন হাজার সাত’শ ৪৪টি; অজ্ঞাত কারণে আট’শ ৯৪টি; উত্তপ্ত ছাই বা জ্বালানি থেকে ছয়’শ ৯৬টি; যন্ত্রাংশের ঘর্ষণের কারণে তিন’শ ৬টি; অগ্নি সংযোগ ঘটানো হয় দুই’শ ৩১টি; খোলা বাতির ব্যবহারে পাঁচ’শ ৯৬টি; আর বিবিধ কারণে এক হাজার ৮২টি অগ্নিকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে।
অগ্নি দুর্ঘটনার আতঙ্ক থেকেই ছোট আকারের আগুন, বড় আকার ধারণ করে। এর ফলে আর্থিক ক্ষতি ও জীবনহানির ঘটনা বেশি হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. এনামুল হক।
তিনি বলেন, আগুনের সূত্রপাত হলে প্রাথমিক অবস্থায় দিয়াশলাইয়ের কাঠির আগুনের মতই থাকে। কিন্তু অগ্নি দুর্ঘটনার আতঙ্ক থেকে সবাই দূরে সরে যায়। যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে আগুণের আকার বেড়ে যায়। তবে অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে অসচেতনতার কারণে।
ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিং দেশের সকল জনগণের খুব প্রয়োজন বলে জানানও তিনি। এনামুল হক বলেন, সাধারণের মাঝে এই সচেতনতা বাড়ছে।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে, অগ্নি দুর্ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স’র সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে প্রায় ৪০ শতাংশ আগুণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছেন সাধারণ জনগণ।

