ভয়ঙ্কর অপরাধে কিশোররা

প্রকাশিত: January 22, 2017 | সময়: 9:44 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে এসব কিশোরকে। ফলে রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর অপরাধ উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। চুরি, মাদক পাচার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুনোখুনি এমনকি জঙ্গিবাদেও কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি মাসেই রাজধানীতে কিশোরদের হাতে দুই কিশোর খুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটি রাজধানীর উত্তরায়, পরেরটি তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ায়। এ দুই ঘটনায় উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

পারিবারিক কলহ, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, পরিবারের অসচ্ছলতা, পারিবারিক অবহেলা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, অসৎ সঙ্গসহ নানা কারণে শিশু-কিশোররা অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। দিনের পর দিন তা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শিশু-কিশোর অপরাধীর এক বিরাট অংশই পথশিশু। পারিবারিক বন্ধনহীনতা আর দারিদ্র্যের কারণে তারা সহজেই নানা অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, কিশোর অপরাধ রোধে বিদ্যমান আইনের সংস্কার আনা হবে। এ ব্যাপারে একটি নীতিমালা প্রণয়নের চিন্তাভাবনা চলছে। কিশোররা কেন বিপথগামী হচ্ছে তা চিন্তার বিষয়। বর্তমানে যে কিশোর আইন আছেÑ তার সংস্কার করতে হবে। এ জন্য আইনজ্ঞদের সঙ্গে কথাও হচ্ছে। কিশোর অপরাধ রোধে বাবা-মাকে সজাগ থাকার কথাও বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘গত ৬ জানুয়ারি উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে খেলার মাঠে সমবয়সী কয়েক কিশোর হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। চিকিৎসার জন্য তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

উত্তরার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একই সঙ্গে পড়াশোনা করে নাইন স্টার গ্রুপের প্রধান রাজু ওরফে তালাচাবি রাজু এবং ডিসকো গ্রুপের রায়হান আহমেদ ওরফে সেতু। খেলার মাঠ, ক্লাস বিরতির আড্ডায় দুজনের মধ্যে ভাব জমে। সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের মাঝেই একদিনের কথাকাটাকাটি থেকে এক ক্লাস ওপরের বড় ভাই তালাচাবি রাজুকে মারধর করে সেতু। কিন্তু সেদিন কোনো জবাবই দিতে পারেনি রাজু। বাবা তালাচাবি মেরামতকারীর সন্তান রাজু ঝরেপড়া শিক্ষার্থী।

প্রতিশোধ নিতে নিজের মতো ঝরেপড়া কিশোরদের নিয়ে গঠন করে নাইন স্টার গ্রুপ। শুরুতে ৯ কিশোরকে নিয়ে ওই গ্রুপ গড়ে তোলা হলেও পরে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫-২০ জনে। এরপর পুরনো শত্রু সেতুকে পাল্টা মারধর করা হয়। সেতুও ততদিনে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষ থেকে ঝরে পড়ে। গড়ে তোলে ডিসকো গ্রুপ নামে আলাদা একটি গ্যাংস্টার দল। এতে মাঝে-মধ্যেই ঝগড়া-মারামারি হয় দুপক্ষের। এভাবে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিবদমান দুই গ্রুপের বলি হয় আদনান কবির।

গত বুধবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজকুনিপাড়ায় ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে আবদুল আজিজ (১৬) নামে এক কিশোর খুন হয়। শুধুই কি সামান্য খেলা কেন্দ্র করে এ ঘটনা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উত্তরার ঘটনার সঙ্গে এ ঘটনার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া গেছে। উত্তরার ঘটনার পেছনে যেমন কথিত বড় ভাইরা জুগিয়েছে, তেমনি তেজকুনিপাড়ার ঘটনায়ও।

জানা গেছে, আজিজের বন্ধু মাফিজুর তাদের প্রতিপক্ষের একটি ছেলেকে চাকু দিয়ে ভয় দেখান। এরপর বেলা আড়াইটার দিকে সাইমুন, জুয়েল ও মনিরসহ ৪ থেকে ৫ কিশোর তেজকুনিপাড়া এলাকায় গেলে আজিজ হাতে থাকা চাকু দিয়ে সাইমুনকে আঘাত করতে যায়। সাইমুন সেই আঘাত প্রতিহত করে আজিজের মাথায় পাল্টা আঘাত করে। এতে আজিজের মৃত্যু হয়।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় খেলাঘরের মাঠকে কেন্দ্র করে এলাকার ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী একদল কিশোরের মধ্যে কে কার বড়, এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই ছোটখাটো ঝগড়া হতো। তবে তাদের মধ্যে যারা একটু সিনিয়র, তারা ঝগড়া মিটিয়ে দিত।

কিশোরদের জঙ্গিবাদেও ধাবিত করা হচ্ছে। এমন ঘটনা ঘটে গত বছর। নব্য জেএমবির নেতা তানভীর কাদেরী তার ১৪ বছরের দুই যমজ কিশোর পুত্রকে স্কুলের পাঠ চুকিয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল। দুই ছেলের মধ্যে তাহরীম কাদেরী এখন টঙ্গীর কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে। আরেক ছেলে আফিফ কাদেরী কিছুদিন আগে পূর্ব আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানকালে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, বিশ্বায়নের ফলে সমাজ এক ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিনদেশী সংস্কৃতির অবাধ প্রবাহের কারণে সহজেই মানুষ অনেক কিছু পাচ্ছে। ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিষয়টিকে আরও সহজ করেছে। এ সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না অনেক কিশোর। এ কারণেই জড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের অপরাধে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুলতানা আলগীন বলেন, কিশোররা যেভাবে বেড়ে ওঠার কথা ছিল ঠিক সেভাবে বেড়ে উঠছে না। দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই তারা সঠিক পথে থাকছে না। একটা বড় সময় তাদের তেমন কিছু করার থাকে না। সেই সময় তারা এমন সব অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, বাবা-মা ব্যস্ত থাকতেই পারেন। তবে সন্তানরা কোথায় যাচ্ছেন সে বিষয়টি কিন্তু নখদর্পণে রাখতে হবে। ফেসবুক, মোবাইলসহ নানা কারণে তাদের মধ্যে প্রত্যাশা বাড়ছে। কী লাগবে কী লাগবে না, কতটুকু দিতে হবে, যা দেওয়া হচ্ছে তার ব্যবহার ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেটিও দেখতে হবে। রাত জেগে কার সঙ্গে চ্যাট করছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে ছিনতাই হওয়া একটা ফোন কোনো বন্ধুর মাধ্যমে অনেক কম টাকায় কিনল। এরপর আস্তে আস্তে ওই গ্রুপটার সঙ্গে তার সখ্য বাড়তেই থাকে। যে কোনোভাবে তারা বিভ্রান্ত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কিশোরের অনেকের মধ্যে আগে থেকেই একটা সমস্যা থাকতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যেটাকে বলা হয়, ‘কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার’। এটাই যখন বাড়তে থাকে তখন সমস্যা বড় আকার রূপ নেয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, এখন দেখা যাচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা এ সবে জড়িয়ে পড়ছে। বাবা-মায়ের প্রচ- ব্যস্ততায় সন্তানদের মূল্যবোধ গঠনে পারিবারিক যে সংস্কৃতি দরকার সেটি হয়ে ওঠে না। তখন বিরূপ পরিবেশে বড় হতে থাকে তারা। অনেকেই এক সময় স্বপ্ন দেখতে থাকে এলাকার আধিপত্য এমনকি পুরো শহরের আধিপত্য আয়ত্ত নেওয়ার। বাবা-মাসহ সংশ্লিষ্টরা সচেতন না হলে এটি বাড়তে থাকবে।

১৮ বছরের কমবয়সীদের শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে জাতিসংঘ সনদে। ক্রিমিনাল পেনাল কোড অনুযায়ী ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের বিচার শর্তাধীন। তবে এর উপরের বয়সীদের বিচার হবে শর্তহীনভাবে। বিচারহীনতা শিশু-কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দৈনিক আমাদেরসময়