বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে দুজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে পুলিশ জানালেও তাদের কাউকে গত দুই বছরেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। হত্যায় সরাসরি জড়িতদের একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বলা হলেও অন্যদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পরিকল্পনাকারী সেলিমকে ধরতে পারলে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই সেলিমের প্রকৃত নাম-পরিচয় এখনো বের করা যায়নি। তাঁর একটা ছবি পুলিশের হাতে এসেছে, সেটা গণমাধ্যমে প্রকাশ ও ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকারীদের রক্তমাখা চাপাতি, চুল, ব্যাগ, অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, পত্রিকা, জিনস প্যান্ট, তুলা, স্যাভলন, টিস্যু পেপারসহ ১৩ ধরনের আলামত পুলিশ উদ্ধার করে সেসব ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) এফবি আই পরীক্ষাগারে পাঠায়। সেই ডিএনএ পরীক্ষার ফল ঢাকায় তদন্তকারী সংস্থার কাছে এসেছে। কিন্তু এ মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে যে আটজন এখন গ্রেপ্তার আছেন, তাঁদের কারও সঙ্গে ওই ডিএনএ নমুনা মেলেনি। এ অবস্থায় অনেকটা অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে পুলিশ।
মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) কর্মকর্তাদের দাবি, তদন্তে অগ্রগতি আছে। অভিজিৎ হত্যায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের একজন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলামের শরিফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা গত জুনে ঢাকার মেরাদিয়ায় পুলিশের সঙ্গে এক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার নির্দেশে এবং সেলিমের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে জঙ্গিরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, সেলিম ধরা পড়লে অভিজিৎ হত্যায় জড়িত সবার সম্পর্কে জানা যাবে এবং তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে অভিজিৎকে হত্যার আগে তাঁর আশপাশে জঙ্গি নেতা সেলিম, শরিফুলসহ ছয়জনকে অনুসরণ করতে দেখা গেছে। সেলিমকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও তাঁর ব্যাপারে তথ্য দিতে জনগণের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির কাছে অভিজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হামলায় আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। তাঁরা দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। বইমেলা উপলক্ষে দেশে এসেছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালে বইমেলা চলাকালে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে খুন হওয়ার দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আনসারুল্লাহর শরিফুল, সেলিম, সাজ্জাদসহ সাত-আটজন অভিজিৎ রায়ের গতিবিধি অনুসরণ করেছেন। এর মধ্যে শরিফুলসহ পাঁচজনকে বেশির ভাগ সময় দেখা যায়। পুলিশের ধারণা, এই আটজনই অভিজিৎ হত্যায় জড়িত। এ ছাড়া লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর মালিক আহমেদুর রশীদকে হত্যার চেষ্টায় গ্রেপ্তার করা সিহাব পুলিশকে জানিয়েছেন, অভিজিৎ হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছেন শরিফুল।
ঘটনাস্থলের আশপাশে সন্দেহভাজন ছয়জনের ভিডিও ফুটেজ গত ২১ আগস্ট ডিএমপি ফেসবুক পেজে আপলোড করা হয় তাঁদের ধরিয়ে দিতে। কিন্তু জনগণের সাড়া পাওয়া যায়নি। যদিও ওই ছবিতে কারও নাম বা ঠিকানার উল্লেখ ছিল না।
গত বছরের ১৭ আগস্ট মহানগর পুলিশের অনলাইন নিউজ পোর্টাল ডিএমপি নিউজে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বলা হয়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শীর্ষস্থানীয় নেতা সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২-কে অভিজিৎ হত্যায় ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলো। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এগুলো তাঁর প্রকৃত নাম না-ও হতে পারে। সেলিমের উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি, গায়ের রং শ্যামলা এবং তিনি চশমা পরেন। বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর কোনো ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি।
অভিজিৎ হত্যার দুই বছর পূর্তি আর তিন দিন পর। এখনো বিচার পায়নি তাঁর পরিবার। তাঁর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, ‘অভিজিৎকে হত্যাকারী শরিফুল ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে বলে শুনেছি। পুলিশ যাদের নাম ও ছবি প্রকাশ করেছে, তাদের গ্রেপ্তার করুক। তা না হলে তাদের ঠিকানা সংগ্রহ করে হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দিতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলা তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলেই পুলিশ বলে অগ্রগতি আছে, আসামিরা শনাক্ত হয়েছে। এর বাইরে তো পুলিশ আমাকে কিছু জানায় না।’ প্রথম আলো

