আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥
ম্যানচেষ্টারে বোমাহামলাকারী সালমান আবেদি বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে এ ধরনের হামলা করেছে বলে ক্লু খুঁজে পেয়েছে ব্রিটেনের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। ইতিমধ্যে লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে সালমানের বাবা ও ২ ভাইকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সালমানের সঙ্গে প্যারিস ও ব্রসেলসে বোমাহামলাকারীদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও সালমানের পরিবার আল-কায়েদা ও আইএস জঙ্গি সমর্থক বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। সালমান ও তার ভাইয়েরা উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশে নিয়মিত যাতায়াত ও জঙ্গি প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়েছে।
সালমানের ছোট ভাই হাশেম ম্যানচেষ্টারে হামলার পরিকল্পনা এক মাসেরও বেশি সময় আগে থেকেই জানত। তাদের বাবা সিরিয়ায় আল-কায়েদার সমর্থন করতেন প্রকাশ্যে। নিজেও এক বিপ্লবী যোদ্ধা হিসেবে লিবিয়ার সাবেক শাসক মোয়াম্মর গাদ্দাফির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৯০ এর দশকে লিবিয়ায় ইসলামিক ফাইটিং গ্রুপের সদস্য ছিলেন। ওই গ্রুপটির সঙ্গে আল-কায়েদার সংশ্লিষ্টতা ছিল। লিবিয়ান ইসলামিক ফাইটিং গ্রুপ ভেঙে যাওয়ার পরও রামাদান সালাফি জিহাদি মুভমেন্ট করতেন। একে সালাফিবাদের উগ্র ধারা বলে বিবেচনা করা হয় এবং তার ওপর ভিত্তি করেই আল-কায়েদা ও আইএস গড়ে উঠেছে। গ্রেটার ম্যানচেষ্টার পুলিশ বলছে এটা পরিস্কার সালমানের সঙ্গে একাধিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের যোগাযোগ ছিল।
সালমানের সংশ্লিষ্টতা ছিল মোহাম্মদ আবরিনির সঙ্গে যিনি প্যারিস ও ব্রাসেলসে হামলার সঙ্গে জড়িত এবং ২০১৫ সালে ম্যানচেষ্টার সফর করেন। লিবিয়া থেকে সালমানের বাবা রামাদান ও তার ভাই হাশেমকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। লিবিয়ার গোয়েন্দা পুলিশ হাশেমের সঙ্গে আইএস জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এবং সে সে ত্রিপোলিতে হামলার করার পরিকল্পনা করছিল। সালমানের বড় ভাই ইসমাইল আবেদিকেও গ্রেফতার করা হয়েছে ম্যানচেষ্টার থেকে।
সালমানের মা সামিয়া একজন পরমাণু বিজ্ঞানী। আল কায়েদা নেতা আবু আনাস আল আল লিবি (যাকে ২০১৩ সালে ত্রিপোলির রাস্তা থেকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী তুলে নিয়ে যায়)-এর স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সামিয়া। ১৯৯৮ সালে আফ্রিকায় দুটি মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলায় আল লিবির জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এফবি আই-এর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এই আল-কায়েদা নেতা ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা হেফাজতে মারা যান। সালমানের বাবা রামাদান একবার তার প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে আল-লিবির ছবি দেন।
সালমানের ভাই হাশেম আইএস সমর্থিত সাইটগুলোতে কমেন্ট করতো। লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হাশেম এর আগে জানায়, সে ও তার ভাই, দুইজনই আইএস-এর সদস্য। সালমানের বোন জোমানা (১৮) ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, শান্ত স্বভাব হলেও তার ভাই সালমান চারপাশের অবিচার দেখে এধরনের জঙ্গি তৎপরতায় উৎসাহীত হতে পারে। জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে ম্যানচেষ্টারের ডিডসবারি মসজিদের ইমাম বক্তব্য দেওয়ার পর সালমান তার বিরোধিতা করে এবং সালমানকে সেখানে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তার বোন জোমানা আরো জানায়, সালমানের এক বন্ধু আব্দুল ওয়াহব হামিদানকে ছুড়িকাঘাত করে হত্যার পর সে মুষড়ে পড়ে। এবং সিরিয়া সহ নানা মুসলিম দেশে মুসলমান শিশুদের কান্না ও দুর্দশার ছবি তাকে পীড়িত করে তোলে।
এদিকে এবিসি নিউজ বলছে, সালমানের বাড়িতে বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও ওয়ার্কশপ পাওয়া গেছে যেখানে একাধিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। ম্যানচেষ্টারে বোমা হামলার কিছুক্ষণ আগে সালমান তার মা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানী সামিয়া তাব্বাল (৫০) ফোন করে কথা বলে এবং এসময় তার ভাই ও মাকে কাছাকাছি থাকার অনুরোধ জানায়। সালমানের মা এ বিষয়টি বিবিসি নিউজসাইটকে জানান।
এদিকে সালমানের বাবা রামাদানের বিরুদ্ধে লিবিয়ায় গাদ্দাফি কর্তৃপক্ষ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ১৯৯৩ সালে সে ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করার পর বসবাসের অনুমতি পায়। তার ছেলে হাশেমকে মেশিন গান নিয়ে ছবি পোস্ট করার সময় ছবিতে তিনি ‘দি লায়ন হাশেম.. ইজ ট্রেনিং এমন মন্তব্য জুড়ে দেন।
সালমানের বন্ধুরা জানিয়েছে ব্রিটেনে তাদের বন্ধুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে সালমানের বাবা দুই ছেলের পাসপোর্ট কেড়ে নেন যাতে তারা ব্রিটেন না যেতে পারে। কিন্তু হজের কথা বলে সালমান তার বাবার কাছ থেকে পাসর্পোট ফেরত নিতে সমর্থ হয়। সালমানের বাবা রামাদান বলেন, নিরীহ মানুষকে হত্যায় আমরা বিশ্বাস করি না। পরিবারের পক্ষ থেকে সালমনের উগ্রসমর্থক হয়ে পড়ার বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছিল। এছাড়া ডিডসবারি মসজিদে সালমানের ভাই ইসমাইল কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সময় মুসলিম তরুণদের মধ্যে জঙ্গি তৎপরতা সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ছে বলেও কাউন্টার টেরিরিজম ইউনিটের কাছে রিপোর্ট করেন।
সালমানের এক বন্ধু যে তাকে ৭ বছর ধরে চেনে সে বলছে, সালমান ভদকা পান করতে পছন্দ করত। ধুমপানও করত। মসজিদের ইমাম জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে কথা বলার পর তার সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে সে নামাজ ছেড়ে দিয়েছিল। পার্টিতে মেয়ে বন্ধু নিয়ে ফুর্তি করত। লিবিয়া ও সোমালিয়ার একটি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। ফুটবলের সমর্থক হলেও এক পর্যায়ে সালমান কম্পিউটার গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে ।

