জঙ্গিরা যে কারণে আত্মঘাতী

প্রকাশিত: June 16, 2017 | সময়: 10:18 am

বাংলাভূমি ডেস্ক ॥
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেসব জঙ্গি আস্তানায় গত কয়েক মাসে অভিযান চালাচ্ছে, বেশিরভাগ আস্তানার জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ না করে আত্মঘাতী হচ্ছে। তারা জীবিত ধরা না দিয়ে বোমায় নিজেদের উড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি জঙ্গিদের আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। কিন্তু কেন জঙ্গিরা ধরা না দিয়ে আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজেদের প্রাণ দিচ্ছেÑ এ বিষয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অনেক অজানা তথ্য। প্রশিক্ষণকালেই জঙ্গিদের বোঝানো হয় তাগুদ পুলিশ বা র‌্যাবের কাছে ধরা দিলে জান্নাতের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ। আর ধরা না দিয়ে বোমায় নিজেদের উড়িয়ে দিলে নিশ্চিত জান্নাতে যাওয়া যাবে। এভাবে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের মগজ ধোলাই করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের ডিআইজি মনিরুল ইসলাম বলেন, কোনো জঙ্গি জীবিত ধরা পড়লে সংগঠন সম্পর্কে গোপন তথ্য পুলিশ জেনে যাবে। সহযোগী কিংবা নেতাদের সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেÑ এ জন্য তাদের ওপর নির্দেশ থাকে কোনোভাবেই জীবিত ধরা দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া আত্মঘাতী হলে শহীদি মর্যাদা এবং নিশ্চিত জান্নাতে যাওয়া যাবে বলে তাদের ধর্মের দোহাই দিয়ে বোঝানো হয়। যে কারণে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান বলেন, যখন কোনো দেশে জঙ্গিগোষ্ঠী বিস্তার লাভ করে তাদের বিভিন্ন ফোর্স থাকে। এর মধ্যে আত্মঘাতী, টার্গেট কিলিংয়ের জন্য আলাদা স্কোয়াড থাকে। টানা অভিযানের ফলে আমাদের দেশের জঙ্গিরা অনেকটা মারজিনালাইজড হয়ে পড়েছে। এখন তারা আত্মঘাতী হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে চাইছে। আরেকটা বিষয় আত্মঘাতী হামলা হলে অনেক হইচই হয়। সরকারের ভাবমূর্তি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রচারণা, মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠাÑ এ সব খুব বেশি হয়। এটাই জঙ্গিরা চায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ বলেন, আত্মঘাতী হওয়াটা কিন্তু অনেক জঙ্গির তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত। যখন দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিছু করার নেই তখন অনেকেই আত্মঘাতী হয়। এটা নব্য জেএমবির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। ধরা পড়া যাবে না, প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করতে হবে।
গত বছর গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর নব্য ধারার জেএমবির সদস্যদের গ্রেপ্তারে র‌্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। অভিযানকালে আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানায় প্রথম আত্মহত্যা করেন জঙ্গি নেতা আবদুল করিম ওরফে তানভীর কাদেরী। এই জঙ্গি নেতা গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। একইভাবে গাজীপুরের একটি জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানকালে দুই জঙ্গি গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর পর বেশির ভাগ জঙ্গি আস্তানায়ই সুইসাইডল ভেস্ট পরে নিজেদের উড়িয়ে দেন জঙ্গিরা। চলতি বছরের মার্চ মাসের ৭ তারিখ থেকে পুলিশ জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু করে। ৭ মার্চ কুমিল্লায় একটি বাসে তল্লাশিকালে পুলিশের দিকে বোমা ছুড়ে ধরা পড়ে ‘নব্য জেএমবির’ দুই জঙ্গি। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের একটি বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। ১৫ মার্চ সীতাকু-ের আমিরাবাদের এক বাড়ি থেকে বিস্ফোরকসহ এক জঙ্গি দম্পতিকে আটক করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরের দিন ১৬ মার্চ একই এলাকার একটি বাড়িতে ১৯ ঘণ্টা অভিযান চালায় পুলিশ। ওই অভিযানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ও গুলিতে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হন। ১৭ মার্চ দুপুরে আশকোনায় র‌্যাবের প্রস্তাবিত সদর দপ্তরে আত্মঘাতী হামলায় এক জঙ্গি নিহত হন। ২৩ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ীতে ‘আতিয়া মহল’ নামে একটি পাঁচতলা বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার খবর পায় পুলিশ। এর পর পুলিশ ওই বাড়ি ঘিরে ফেলে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সোয়াট সদস্যরা। পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো দল পরদিন ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ শুরু করে। উদ্ধার করেন ওই ভবনে আটকা পড়াদের। এর পর ভেতরে অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানে এক নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হন। ২৪ মার্চ রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গোলচত্বর সংলগ্ন পুলিশ বক্সের সামনে ‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণে এক জঙ্গি নিহত হন।
পরবর্তীকালে মৌলভীবাজারের নাসিরপুরের ফতেহপুর আস্তানায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের অভিযানে ৭ থেকে ৮ জন জঙ্গির ছিন্নভিন্ন মরদেহ পায় পুলিশ। নিহতদের মধ্যে চারজন ছিল শিশু। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ বেশ কয়েকটি আস্তানায় পুলিশ অভিযান চালানোর আগে আত্মসমর্পণ করতে সুযোগ দেয়। কিন্তু তারা আত্মসমর্পণ না করে আত্মঘাতী হয়। আমাদের সময়