স্টাফ রিপোর্টার ॥
সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী।
মঙ্গলবার (২২ আগষ্ট) বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের অব্যাহত টানপোড়েনের মধ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার সাব্বির ফয়েজ জানান, বৈঠকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
গত ১ আগস্ট বিচারপতিদের অপসারণ-সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ সাত বিচারপতির স্বাক্ষরের পর ৭৯৯ পৃষ্ঠার এ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। এর আগে গত ৩ জুলাই বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
এ মামলায় নয়জন বিশিষ্ট আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আই ফারুকী, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, বিচারপতি টি এইচ খান, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ফিদা এম কামাল ও এ জে মোহাম্মদ আলী।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র। রায়ে আরো বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশের অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল বা ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলরের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে।
আদালত রায়ে আরো বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। তাঁরা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার ফলে সাংসদদের সব সময় দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাঁরা দলের বাইরে যেতে পারেন না। যদিও বিভিন্ন উন্নত দেশে সাংসদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আছে।
রায়ে বলা হয়, মানুষের ধারণা হলো, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে। সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যাবে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ ছাড়া রায়ের পর স্বাগত জানান বিএনপি এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবীরা।
এদিকে ২৪ আগস্টের মধ্যে প্রধান বিচারপতি পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়েছেন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস।
ষোড়শ সংশোধনীর রায় বাতিল করে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ছাড়তে এস কে সিনহার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা।
বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনার ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ১ অগাস্ট প্রকাশের পর থেকেই প্রধান বিচারপতির সমালোচনামুখর সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা।
রায়ের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি সিনহা বাংলাদেশের রাজনীতি, সংসদ, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে মত দিয়েছেন তার সমালোচনা চলছে।
রোববার প্রধান বিচারপতির পাকিস্তানের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে আদালতের রায়ের প্রসঙ্গ উত্থাপনকেও ভালোভাবে দেখছে না সরকার।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে বলেন, রায় দেওয়ার আগে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ করা উচিত ছিল। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবির জানিয়ে আলটিমেটাম দেওয়া হয়।

