মাহফুজ উল্লাহ ॥
সমাজে দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও মতভেদ নতুন কোনো বিষয় নয়। মানুষ আদিলগ্ন থেকেই এই বিষয়গুলো দেখে এসেছে। এসবের কারণে পরিস্থিতি যে তিক্ত হতে পারে সে অভিজ্ঞতাও প্রত্যেকের আছে। কিন্তু তার পরও আমরা বাস্তবতাকে ভুলে যাই এবং মতভেদ বা ভিন্নমতের প্রক্রিয়াকে হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়ায় রূপান্তরিত করি। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় প্রত্যেককেই মূল্য দিতে হয়। কখনো কখনো এই মূল্য করুণ পরিস্থিতি ডেকে আনে।
কথাগুলো গত কয়েক দিনের বাংলাদেশের খুব প্রবলভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। বিশ্ব বিদ্যালয়ের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ, খুন, ধর্ষণ, মোবাইল চুরির মতো ঘটনায় শিশুকে পুঁড়িয়ে মারা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। আমাদের চোখের সামনে ঘটছে এসব ঘটনা। কিন্তু আমরা নিরুত্তর। কিছু ঘটনা আছে যেগুলো নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই।
এসব বিষয় ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণের বিষয়। সরকার ইচ্ছা করলেই কঠোর হস্তে এসব দমন করতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার মোহ অনেক সময়ই মানুষকে বিচার বুদ্ধি থেকে দূরে নিয়ে যায়। তবে বিচার-বুদ্ধি লোপ পেলে তখন সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হয় না।
এত গেল নিজেদের মধ্যকার বিরোধের কথা। এই বিরোধ শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যা এতটা প্রকট হতো না। কিন্তু এখন এই বিরোধ, এই দ্বন্দ্ব অন্যদেরও গ্রাস করছে। অতীতের দিকে না তাকিয়ে যে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাওয়ার সময় খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরের ওপর হামলা। এবারের হামলা একটু ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। অর্থাৎ হামলা পরিচালিত হয়েছে গণমাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধে, যাতে এই নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি করা যায়।
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে যে হামলা হবে সেটা আগেই অনুমান করা গিয়েছিল। এই সফরের আগে সরকারি দলের বিভিন্ন নেতারা যে মন্তব্য করেছেন তাতে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে যাত্রাপথে খালেদা জিয়ার বহরকে রাজনৈতিক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে এবং বাস্তবেও তাই ঘটেছে। খালেদা জিয়া কোন পথে কক্সবাজার যাবেন সেটাও ক্ষমতাসীন দল চাপিয়ে দিতে চেয়েছে।
একটি স্বাধীন দেশে একজন স্বাধীন মানুষ চলাচলের, জীবনধারণের, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করে। এই স্বাধীনতা যদি না থাকে তাহলে সেটা অগণতান্ত্রিক শাসন হিসেবেই বিবেচিত হয়। রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেওয়ার জন্য অনেক মানুষই সড়কপথে সেখানে গিয়েছেন। তখন কোনো সমস্যা হয় নি। সমস্যা বেধেছে যখন খালেদা জিয়া পথে নেমেছেন। সম্ভবত খালেদা জিয়া পথে নামার সঙ্গে জনসমাবেশের প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িত বলেই এই অবস্থা। ক্ষমতাসীন দলের একটা প্রিয় বাক্য ছিল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি নিঃশেষিত হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তার উল্টো। নির্যাতনের ভয়ে যে মানুষেরা রাস্তায় নামতে ভয় পায় তারাই চিকিৎসা শেষে খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার দিনে যে শক্তি দেখিয়েছেন তাতে প্রমাণ হয়েছে এই দলটির রাজনীতির ভিত্তি দুর্বল নয়। যে কথাটি বিভিন্ন সময়ে বলার চেষ্টা করেছি তা হচ্ছে শত উত্থান-পতন, নির্যাতন, জেল-জুলুম কোনো কিছুই বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তন করতে পারে নি। দু-একজন রাজনীতিবিদ বা কিছু লোকের এদিক সেদিক আসা যাওয়া দলকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারেনি। দুটি দলই সদস্য ও সমর্থক সংখ্যা অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছে। এর কয়েকটি কারণ আছে। প্রধান কারণটি হচ্ছে মানুষ দেখে এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে বুঝে রাজনৈতিক আনুগত্য গ্রহণ করে। খুব মারাত্মক কিছু না ঘটলে সে তার এ বিশ্বাসকে ত্যাগ করে না। রাজনৈতিক বিশ্বাসের উন্মাদনা কখনো কখনো ধর্মীয় উন্মাদনাকে ছাড়িয়ে যায়। কাজেই এটা মনে রাখা প্রয়োজন শুধু মুখের কথা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায় না। এটা মনে রাখলে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার প্রয়োজন হতো না।
কিন্তু এবারের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণমাধ্যমের মানুষ ও সম্পদ। যা হওয়ার কথা ছিল না। অবশ্য বর্তমান সরকারের আমলে গত কয়েক বছরে অসংখ্য গণমাধ্যমকর্মী হিংসার শিকার হয়েছেন, কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। গণমাধ্যম যেহেতু সংজ্ঞানুযায়ী অসহায়, বঞ্চিত মানুষদের কথা বলে তাই ক্ষমতাসীনরা এসব অভিযোগকে অস্বীকার করে। পৃথিবীতে বহু দেশেই এই অস্বীকৃতির সংস্কৃতি চালু আছে। হামলার ঘটনার পর সেটাকে বিভিন্ন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে সেটা গণমাধ্যমকর্মীদের চোখের সামনেই ঘটেছে। এ হামলার ফলে তারা দুপুরের খাবার পর্যন্ত খেতে পারেননি, পরে অবশ্য বিভিন্নভাবে এই আহত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্ধার করা হয়। গণমাধ্যমকর্মীরা নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পেরেছেন এরা কারা। এরা নিঃসন্দেহে দুর্বৃত্ত নয়। অথচ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এদের দুর্বৃত্ত বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে ক্ষমতাসীনদের গায়ে নতুন কলঙ্ক না লাগে। গণমাধ্যম হয়তো বলবে আমরা অসত্য ভাষণ করিনি। এ ধরনের হামলা যারা করে তারা তো দুর্বৃত্তই। এটা ঠিক কিন্তু এরা সাধারণ দুর্বৃত্ত নয়, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের লালন করলে এক সময় সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। তখন মিডিয়াও এদের হাত থেকে রেহাই পায় না।
মিডিয়া যেভাবেই অখ্যায়িত করুক না কেন মানুষ ঠিকই এই হামলাকারী দুর্বৃত্তদের চিনতে পেরেছে। এসব দুর্বৃত্তরা অপরিচিত কেউ নয়। এ কারণেই গণমাধ্যমের উচিত হবে এদের সত্যিকারের পরিচয় পরিচিত করানো। গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতার জন্যই তা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে গণমাধ্যম এদের পরিচয় জানে।
লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক

