নতুন মুখ ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ডে

প্রকাশিত: October 3, 2013 | সময়: 11:32 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ডে নতুন মুখ। অজানা-অচেনা এই মুখগুলোই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো রাজধানী। নিয়ন্ত্রণ করছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, খুন, জখম, ছিনতাই-চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা ও অপরের জমি দখলসহ নানা অপরাধ। ছিঁচকে মাস্তান থেকে এরাই হয়ে উঠছে পেশাদার সন্ত্রাসী। এদের বেশির ভাগই চাঁদাবাজি, ছিনতাই ছাড়াও ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করছে। তাদের অনেকের ঝুলিতেই রয়েছে দু-চারটি খুনের অভিজ্ঞতা। এরাই নিয়ন্ত্রণ করছে রাজধানীর আন্ডার ওয়ার্ল্ড। এক সময়ে যারা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের শিষ্য ছিল এখন তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রণ রাজধানীর অনেক এলাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব সন্ত্রাসীর হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। উঠতি এ সন্ত্রাসীরা প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশ থেকে চড়া দামে কিনে আনছে আধুনিক সব অস্ত্র। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব খুনের ঘটনা ঘটছে অধিকাংশ ঘটনাতেই ব্যবহার হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। সূত্র জানায়, যেসব ঘটনায় অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে তার প্রতিটির সাথেই জড়িত রয়েছে রাজধানীর উঠতি মাস্তান। তাদের অধিকাংশই হচ্ছে নতুন মুখ। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারীদের কাছে এরা অচেনা-অজানা। একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে চললেও তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি, কোনো কোনো ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করাও সম্ভব হচ্ছে না।

গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকায় দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হয়েছেন হোম টেক ডেভেলপার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জাফরুল হক মোক্তার (৫৫)। দুর্বৃত্তরা তার বাসায় ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করে। প্রত্যদর্শীরা জানান, তিন দুর্বৃত্ত এই হত্যার মিশন চালায়। তাদের হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে একজন ঘরে ঢুকে জাফরুলকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করে। বাকি দু’জন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ এবং গোয়েন্দা সূত্র জানায়, যারা এই খুনে অংশ নিয়েছে তারা প্রত্যেকেই পেশাদার সন্ত্রাসী। কিন্তু তাদের সম্পর্কে এখনো কোনো হদিস মেলাতে পারেনি পুলিশ গোয়েন্দারা। গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর রামপুরা এলাকায় নিজ বাসায় খুন হয়েছেন সিআইডির সাবেক অ্যাডিশনাল এসপি ফজলুল করিম। বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও ফজলুল করিম হত্যার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, এ ঘটনার পর মতাসীন দলের কয়েক ক্যাডার এলাকা ছেড়েছিল। পত্রপত্রিকায় তাদের কয়েকজনের নামও এসেছিল। কিন্তু এখন আবার তারা এলাকায় বহাল তবিয়তে। অভিযোগ রয়েছে মাদক ব্যবসায় বাধা দেয়ায় স্থানীয় কিছু চিহ্নিত মাস্তান ফজলুল করিমকে খুন করেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রামপুরা, বাড্ডা, বাসাবো ও শাহজাহানপুর মিলে শতাধিক মাস্তান রয়েছে। এরা এলাকায় নতুন মুখ। এদের হাতেই এখন এলাকার মাস্তানী-চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ। রামপুরা-বাড্ডায় আরেক নতুন মুখ হচ্ছে ভাঙাড়ি স্বপন।

পুরো এলাকা অস্থির করে রেখেছে উঠতি এই সন্ত্রাসী। গত ২৯ জুলাই রাজধানীর গুলশানে খুন হন ঢাকা মহানগর দণি যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকী। এই ঘটনায় ধরা পড়ে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দেিণর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারেকসহ সাতজন। তারেক পরে র্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। মিলকী হত্যার ঘটনায় যুবলীগ নেতা চঞ্চল, টিপু ও আরিফসহ কয়েকজনের নাম উঠে এলেও তারা এখনো গ্রেফতার হয়নি। মিলকী হত্যার ঘটনায় যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে তাও উদ্ধার হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিলকী হত্যার ঘটনায় অংশ নেয়া সন্ত্রাসীরা সবাই উঠতি মাস্তান হলেও তাদের হাতেই রাজধানীর অনেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল। সূত্র জানায়, এই হত্যাকাণ্ড এবং তারেক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পরও ওই সব সন্ত্রাসীর অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছিল।

কিন্তু এখন তারা আবারো বহাল তবিয়তে। মিরপুরের গোড়ানচটবাড়ি এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে বেলায়েত এবং তার সহযোগীরা। স্থানীয় সূত্র জানায়, বেলায়েতের বিশাল বাহিনী এই এলাকায় একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। মিরপুরে খুন হয়েছেন যুবলীগ নেতা রকি। ঘটনার সাথে কিছু নতুন মুখ জড়িত বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। গুলিস্তানের কালাবাচ্চু এখন মানুষের কাছে ত্রাস হিসেবে পরিচিত। সূত্র জানায়, পরিবহন শ্রমিক নেতা নামধারী এই সন্ত্রাসী এখন পুরো গুলিস্তান ও এর আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পেশাদার সন্ত্রাসী জয়, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, নবী হোসেন, আদনান, হারিস, প্রিন্স মহব্বত, আশিক, প্রকাশ, বিকাশ, শাহাদাত, খোরশেদ, পিয়াল, জিসান, আগা শামীম, নাসির, ইমাম হোসেন, ওমর ফারুক কচি, মশিউর রহমান কচি, সানাউল্লাহ, কালা মাবুদসহ রাজধানীর শীর্ষ সারির সন্ত্রাসীদের প্রত্যেকেই আত্মগোপনে। আবার শীর্ষ সারির সুইডেন আসলাম, যোশেফ, কিলার আব্বাসসহ অনেকেই বর্তমানে জেলে বন্দী আছে।

এসব সন্ত্রাসীর অনুপস্থিতি এখন পূরণ হচ্ছে উঠতি মাস্তান দিয়ে। এসব সন্ত্রাসীর অনেককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও চেনেন না। রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এসব সন্ত্রাসীর অবাধ বিচরণ। ধানমন্ডি এলাকার এক বাসিন্দা জানান, ওই এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বিশেষ করে ঝিগাতলা, ধানমন্ডি ১৫ নম্বর, ২৭ নম্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পরই এসব মাস্তানের আনাগোনা বেড়ে যায়। দামি মোটরসাইকেলই তাদের বাহন। এসব মোটরসাইকেলের অধিকাংশই নম্বর প্লেট ছাড়া। পুলিশের চোখের সামনেই এগুলো ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু পুলিশ ধরে না। একই সাথে ১০-১৫টি মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়ায় নামে এসব সন্ত্রাসী। বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও এদের ভিড় ল্য করা যাচ্ছে নিয়মিত। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেকটিতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ল্য করা গেছে। যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে তা উদ্ধার হচ্ছে না। এমনকি খুনের ঘটনায়ও যেসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে তা-ও উদ্ধার হচ্ছে না।

এ দিকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডে নতুন মুখদের ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেলের ডিসি মাসুদুর রহমান বলেন, কোনো এলাকায় কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলে, কেউ সহিংস ঘটনার সাথে জড়িয়ে পড়লে তাদের দিকে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সার্বণিক নজর থাকে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের তালিকা একটি চলমান প্রক্রিয়া। পুরনো তালিকার সাথে নতুনরা যুক্ত হয় সেখানে।