বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: বিমার টাকা তুলতে নৌ-বিমা পলিসিতেও অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ। ইনল্যান্ড ট্রানজিট ইন্স্যুরেন্সের (অভ্যন্তরীণ নৌ-বিমা) ১২টি ভূয়া পলিসি দেখিয়ে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ বিমা দাবি করেছে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের বিমা পলিসির অনিয়ম খতিয়ে দেখতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’র (আইডিআরএ) গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। জুলাই মাসের শেষের দিকে এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, বহুল আলোচিত গাজিপুরের কোনাবাড়ির স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস’র কারখানায় আগুন লাগে ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর। গার্মেন্টসটির সব বিমা পলিসি দেখানো হয়েছে একই গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সে।
আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস বিমা প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের কাছে ৪৪৫ কোটি টাকার দাবি উত্থাপন করে। এরমধ্যে রয়েছে নৌ-বিমার আওতায় ১২টি ইনল্যান্ড ট্রানজিট বিমা পলিসি এবং অগ্নি-বিমার ১৬টি পলিসি।
নৌ-বিমার আওতায় ১২টি পলিসির মধ্যে রয়েছে, এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৩৮/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৩৯/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪০/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪১/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪২/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪৩/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪৪/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪৫/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪৬/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪৭/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট), এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪৮/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট) এবং এসআইএল/এইচও/এমপি-১৩৪৯/১১/২০১৪(এক্সপোর্ট) নম্বর পলিসি।
স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের এসব পলিসির পূণঃবিমা করা আছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ বিমা করপোরেশনে। তাই মূলত বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করতে হবে সাধারণ বিমা করপোরেশনকে।
অভিযোগ রযেছে, সরকারি বিমা প্রতিষ্ঠান সাধারণ বিমা করপোরেশন থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ তাদের মালিকানাধীন বিমা প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স’র যোগসাজসে এসব ভূয়া পলিসি তৈরি করেছে।
আইডিআরএ’র তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের দাবি করা ইনল্যান্ড ট্রানজিট বিমার ১২টি পলিসির কোনোটিই ২৮ নভেম্বর অথবা তার আগে করা হয়নি। অথচ স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লাগে ২৮ নভেম্বর মধ্য রাতে। আর যে রাতে আগুন লাগে সেদিনই এসব পলিসি করা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। এসব পলিসির প্রিমিয়াম নেওয়া হয়েছে ২৮ নভেম্বর। ওই তারিখেই সবগুলো পলিসির প্রিমিয়ামের টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা করা দেখানো হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের রাতে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কথিত ইনল্যান্ড ট্রানজিট বিমার আওতাধীন ১২টি বোঝাই লরি কারখানা ভবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বিমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানার মাল বোঝাই লরি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা না হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি সন্দেহজনক।
ইনল্যান্ড ট্রানজিট ইন্স্যুরেন্স’র আওতায় কারখানা থেকে লরি, ট্রাক, ট্রেনে বা পরিবহনে মাল ওঠানো থেকে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত মালামালের ঝুঁকি নেওয়া হয়ে থাকে। তদন্ত প্রতিবেদনে দেয়া তথ্য অনুসারে, এসব পলিসির মেয়াদ ছিল ৭ দিন। মালামাল পরিবহনের ঝুঁকি নেওয়া হয় কারখানা থেকে চিটাগাং সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত।
অনিয়মের বিষয়ে সোমবার দুপুরে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমর কৃষ্ণ সাহার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। এসময় অনিয়মনের বিষয়টি তুলতেই তিনি বলেন, আমি এখন অফিসের বাইরে আছি। আপনি পরে যোগাযোগ করেন। এরপর একাধিক বার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।
আইডিআরএ’র প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিচালকদের ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য ২৬ নং প্রজ্ঞাপন (প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয় ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর) অনুসারে পলিসি করার ১০ দিন আগে আইডিআরএকে জানানোর নিয়ম। কিন্তু পরিচালকের ব্যবসা হওয়ার পরও স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস’র বিমার তথ্য আইডিআরএকে জানানো হয় পলিসি করার এক মাস পর ২৬ ডিসেম্বর।
এছাড়া বিমা দাবি উত্থাপনের দুই দিনের মধ্যে আইডিআরএকে জানানোর নির্দেশনা (এই নির্দেশনাটি জারি করা হয় ২০১১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর) থাকলেও এক্ষেত্রে জানানো হয় ১০ দিন পর ৮ ডিসেম্বর।
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের বিমা দাবি নিয়ে আইডিআরএ তদন্ত কমিটি গঠন করে চলতি বছরের ২০ মার্চ। এর আগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ডের অগ্নি-বিমার অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই তদন্ত কমিটি গঠন করে আইডিআরএ। অগ্নি-বিমার অনিয়মের পাশাপাশি আইডিআরএ’র তদন্তে নতুন করে নৌ-বিমার পলিসিতেও অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
আইডিআরএ’র প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সকে দায়ী করে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিমা আইন ২০১০ অনুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ৬ মাসে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়-ক্ষতি নিরুপনে নিয়োগ পাওয়া জরিপকারীর প্রতিবেদন না পাওয়ায় চুড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারছে না আইডিআরএ। গত ১ সেপ্টেম্বর জরিপ প্রতিবেদন দাখিল করতে ১৫ দিন সময় বেধে দিয়ে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সকে চিঠি দেয় আইডিআরএ। তবে সম্প্রতি জরিপকারী একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আবারো জরিপ প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স।
এদিকে বিমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত ৭ দিনের মধ্যেই জরিপ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। অথচ ১০ মাসেও জরিপ প্রতিবেদন দাখিল করেনি স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ বলেন, তদন্ত কমিটি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি সারসংক্ষেপ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
