বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: পাসপোর্ট কই? ওইটা কি পকেটে রাখার জিনিস! ফরমে এত কাটাছেঁড়া করছিস কেন? নতুন করে লেইখা আন। তুই-তোকারি করতে করতে পাসপোর্টে সিল মারলেন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা। এবার কাস্টমস ও পুলিশের কয়েকজন বলতে শুরু করলেন, কিরে লাগেজ এত বড় কেন? সোনা-টোনা আছে নাকি? কত দিন ধরে বিদেশে থাকিস, খেজুর এনেছিস? বিদেশি টাকা কত আছে, ঈদ বখশিশ দিবি তো ঠিকমতো?দীর্ঘ চার বছর পর ঈদের ছুটিতে প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রেখেই শাহজালাল বিমানবন্দরে এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হন নরসিংদীর আবু হোসেন বিল্লাল। সৌদি আরবের একটি চকোলেট কারখানায় কাজ করা আবু হোসেন দেশে ফেরার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, অদ্ভুত সব প্রশ্ন শুনে ভয় পেয়ে যাই। বুকটা ধুঁক ধুঁক করতে থাকে। ভাবছিলাম, মনের অজান্তে চলাফেরায় হয়তো কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। আমাকে পুলিশে দেওয়া হবে বলে ভয় পাচ্ছিলাম। এই টেবিল, সেই টেবিল করে প্রায় তিন ঘণ্টা পর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরের ভিতর থেকে যখন বেরিয়ে আসি, ততক্ষণে আমি ঘেমে চুপচুপে।
বিদেশ ফেরত যাত্রী আবু হোসেন বিল্লালের সঙ্গে কর্মকর্তাদের এমন আচরণ অদ্ভুত এবং নিজেকে অপরাধী মনে হলেও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই চিত্র নিত্যদিনকার। বিল্লালের মতো হাজার হাজার যাত্রী বিদেশ যাতায়াতে কর্মকর্তাদের নির্দয় আচরণে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির চাকা যাদের পাঠানো অর্থে সচল থাকে, সেই প্রবাসীরাই বিমানবন্দরে এমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন বেশি। বিদেশ গমনের ক্ষেত্রেও যাত্রীরা নাজেহাল হচ্ছেন পদে পদে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিভাগীয় বৈঠকেও এই যাত্রী হয়রানি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়, সিদ্ধান্ত হয় হয়রানি বন্ধের। কিন্তু সিদ্ধান্ত থাকে কাগজে-কলমেই। রেশ পড়ে না বিমানবন্দরে। বরং দিন দিন এই হয়রানির মাত্রা বেড়েই চলেছে।সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান ক্রমেই নিুমুখী। যারা যাত্রীদের সেবা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে বিমানবন্দরে নিয়োজিত আছেন, তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশই হয়রানি করছেন যাত্রীদের। দায়িত্ব পালন আর সেবার নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন টাকাকড়িসহ মূল্যবান সামগ্রী। অবস্থা এমনই একপর্যায়ে পৌঁছেছে, রক্ষকরাই এখন ভক্ষকে রূপ নিয়েছে। ঈদ মৌসুম হওয়ায় বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির মাত্রা বেড়েছে কয়েকগুণ। যত বেশি হয়রানি তত বেশি টাকা, এটা এখন বিমানবন্দরে পরিচিত স্লোগান।
সূত্র জানায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি বাদেও রয়েছে ভিন্ন ধরনের হয়রানি। একসঙ্গে কয়েকটি ফ্লাইট উড্ডয়ন বা অবতরণ করলে যেন ভেঙে পড়তে চায় পুরো বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা। ইমিগ্রেশনের কম্পিউটার ও এর সার্ভার আধুনিক নয়। বিদ্যুতের ভোল্টেজের ওঠানামায় সার্ভার বসে যায়। কাস্টমস-ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথেষ্ট দক্ষ নন। সব মিলিয়ে কাজ চলে মন্থর গতিতে। যাত্রীদের প্রতীক্ষার প্রহর হয় দীর্ঘ। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) রিডারের অভাবে পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাজগপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সময় লাগে প্রচুর। দিল্লি ফেরত যাত্রী আবুল হোসেন বলেন, দিল্লির কাস্টমস-ইমিগ্রেশন কাগজপত্র ঠিক করতে জনপ্রতি সময় নেয় মাত্র এক থেকে পাঁচ মিনিট। আর একই কাজ করতে এখানে সময় লাগল কমপক্ষে এক ঘণ্টা। এখানে কেউই যাত্রীসেবার জন্য নেই। ট্রলিও খুঁজে পাওয়া যায় না। সবাই অপেক্ষায় থাকেন বখশিশ আদায়ের জন্য। একই সময়ে ক্যানপিতে দেখা গেল একটি ট্রলিতে একটি বড় আকারের লাগেজ নিয়ে ছোটাছুটি করছেন দুই যুবক। ট্যাক্সির দালালদের সঙ্গে দরকষাকষি শেষ করে তারাও বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। কামাল ও ফারুক নামের ওই দুজন জানালেন, তারা সৌদি আরবে একটি হাসপাতালে কাজ করেন। মোট চারটি লাগেজ নিয়ে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সৌদি এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে দেশে আসেন। কিন্তু ভিড়ের কারণে সেদিন মাত্র একটি লাগেজ খুঁজে পেয়েছিলেন। কয়েক দফা এসে তারা মাত্র একটি লাগেজের সন্ধান পেয়েছেন। বাকি দুটি লাগেজের খবর নেই।
এ ছাড়া শাহজালালের কোনো ট্যাক্সিই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়া অনুসরণ করে না। যাত্রীদের ভাড়ার তালিকাও দেখানো হয় না। তাই ভ্রমণক্লান্ত যাত্রীরা দালালদের কাছে অনেকটাই জিম্মি।ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ইমিগ্রেশনে বর্তমানে ফোর ট্র্যাক-৩ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশও এ সফটওয়্যার ব্যবহার করে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত হঠাৎ করে সার্ভার ডাউন হলে ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র দিতে দেরি হতো। তবে এখন এ সমস্যা নেই। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ৪০টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার ব্যবহার করা হয় না। চালু কাউন্টারগুলোর মধ্যে টার্মিনাল-১ এ রয়েছে ১২টি এবং টার্মিনাল-২ এ রয়েছে ১৪টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার।বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এটিএস অ্যান্ড অ্যারোডম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের জন্য পর্যাপ্ত কাউন্টার রয়েছে। প্রতিটি কাউন্টারে চারজন লোক রয়েছে। তাদের জন্য আলাদা কম্পিউটারসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা আছে। তবে ইমিগ্রেশন বিভাগের লোকবল কম থাকায় সবগুলো কাউন্টার ব্যবহার হয় না।
এ সমস্যা দূর করতে লোকবল বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে সিভিল এভিয়েশনের এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বেলাল হোসেন যাত্রী হয়রানি তথা দুর্ভোগের প্রধান কারণ হিসেবে বোর্ডিং পাস চেকিং এবং লাগেজ লাউঞ্জে কালক্ষেপণকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, একসঙ্গে দু-তিনটি ফ্লাইট উড্ডয়ন বা অবতরণ করলে তাদের সামাল দেওয়ার মতো যথেষ্ট লোকবল বিমানবন্দরে নেই। এ ছাড়া দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাব তো আছেই।
এসব কারণে কাউন্টারে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তবে তিনি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কোনো দুর্বলতার কথা স্বীকার করেননি। সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে আর্মড পুলিশের দায়িত্ব বহিরাগমন, পার্কিং লট, ক্যানোপি, কনকর্স হল, আগমনী কনভেয়ার বেল্ট বা কাস্টমস হলরুম, টারমাক, রানওয়ে, ড্রাইওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকা। তবে তারা অধিকাংশ সময়ই ব্যস্ত থাকে আগমনী আর কারপার্কিং এলাকায় যাত্রীদের মালামাল তল্লাশির কাজে। বিদেশ থেকে আসা অনেক যাত্রীই বিমানবন্দরে সব কাজ শেষ করে গাড়িতে ওঠার পরই এই আর্মড পুলিশের তল্লাশির মুখোমুখি হয়। নানা প্রশ্নে বিব্রত করা হয় যাত্রীদের। টানাহেঁচড়া করে আবার বিমানবন্দরের ভিতরে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, যাত্রীরা মূলত হয়রানির শিকার হন কাস্টমস হলরুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর।
সেখানে ট্যাক্সিচালক, দালাল, ফুটার (ছিঁচকে সন্ত্রাসী) আর আর্মড পুলিশরা যাত্রীদের নানাভাবে হয়রানি করে থাকে। সূত্র জানায়, বিমানবন্দরে আরেকটি গ্রুপের হাতেও নিয়মিত যাত্রীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই চক্রটি হচ্ছে টার্মিনালের ছিঁচকে সন্ত্রাসী। এরা বিমানবন্দরে ফুটার নামে পরিচিত। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ যাত্রীরা। এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ৩০০-র বেশি। যাত্রী হয়রানির আরেক রুট লস অ্যান্ড ফাউন্ডেশন বিভাগ। কোনো যাত্রীর মালামাল বিমানবন্দরে হারানো গেলে বা লাগেজ না এসে পৌঁছলে তা জানাতে হয় বিমানবন্দরের লস অ্যান্ড ফাউন্ডেশন বিভাগে। অভিযোগ, এই শাখার সদস্যরা কেউই যাত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন না। (বাংলাদেশ-প্রতিদিন)
