Skip to content

লতিফ কী এমপি পদও হারাবেন?

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: পবিত্র হজ, তাবলিগ জামাত ও দলের ভবিষ্যত নেতা সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য দেয়ায় মন্ত্রিসভা থেকে অব্যাহতির পর দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যের পদ থেকেও লতিফ সিদ্দিকীকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, এমপি পদও কী হারাতে যাচ্ছেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ও আত্মম্ভরী রাজনীতিক আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী? এ নিয়ে নানা মহলে জোরালো আলোচনা-গুঞ্জন চলছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের চেতনা ব্যাখা করে ১৯৯৬ সালে দেয়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, প্রাথমিক সদস্যপদ হারানোর পর সংসদ সদস্যের পদও বাতিল হবে।

যা বলেছিলেন লতিফ সিদ্দিকী
গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের একটি হোটেলে নিউইয়র্কে বসবাসরত টাঙ্গাইলবাসীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন লতিফ সিদ্দিকী।

এসময় তিনি বলেন, ‘আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ চিন্তা করলো এ জাজিরাতুল আরবের লোকেরা কীভাবে চলবে? তারাতো ছিল ডাকাত। তখন সে একটা ব্যবস্থা করলো যে আমার অনুসারীরা প্রতিবছর একবার একসঙ্গে মিলিত হবে। এর মধ্য দিয়ে একটা আয়-ইনকামের ব্যবস্থা হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি হজ আর তাবলিগ জামাতের ঘোরতর বিরোধী, জামায়াতে ইসলামীরও বিরোধী, তবে তার চেয়েও বেশি হজ ও তাবলিগ জামাতের।’

হজ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এ প্রবীণ নেতা বলেন, ‘হজের জন্য ২০ লাখ লোক সৌদি আরবে গিয়েছে। এদের কোনো কাম নাই। এদের কোনো প্রডাকশন নাই। শুধু রিডাকশন দিচ্ছে। শুধু খাচ্ছে আর দেশের টাকা দিয়ে আসছে।’

এ সময় তাবলিগ জামাতের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, ‘তাবলিগ জামায়াত প্রতিবছর ২০ লাখ লোকের জমায়েত করে। নিজেদেরতো কোনো কাজ নেই। সারা দেশের গাড়িঘোড়া তারা বন্ধ করে দেয়।’

প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়েও সমালোচনাও করেন মন্ত্রী। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কথায় কথায় আপনারা জয়কে টানেন কেন। ‘জয় ভাই’ কে? জয় বাংলাদেশ সরকারের কেউ নন। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ারও কেউ নন।’

ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, সমালোচনা
পবিত্র হজ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যের পর স্থানীয় প্রবাসীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সংবাদটি দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ প্রবাসীরা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানের জন্য নিউইয়র্কেই ছিলেন। মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে নিউইয়র্কে যান। সেখানে লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের ভিডিও রেকর্ড প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেখেন এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

তার এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতরেও তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিএনপিসহ ইসলামপন্থি দলগুলো তার মন্ত্রিসভা থেকে তাকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।

মন্ত্রিত্ব হারালেন লতিফ
আওয়ামী লীগ সরকার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে ডাক, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী করা হয়। পরে তাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেয়া হয়।

২০০৯-২০১৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

বিতর্কিত মন্তব্যে দল ও দলের বাইরে ব্যাপক সমালোচনার পর রোববার তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়েছে। জারি করা হয়েছে প্রজ্ঞাপন।

রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর শেষে রোববার দুপুরে প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি নিশ্চিত করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা জানান, এ প্রজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর নিয়োগের অবসান হয়েছে।

তবে আরো আগেই লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত হলেও রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব হজে থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণে সংবিধানের ৫৮(২) ধারা অনুসরণ করা হয়েছে।

প্রেসিডিয়াম থেকে বহিষ্কার
রোববার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে প্রেসিডিয়াম থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে বহিষ্কারের প্রস্তাব করেন। এসময় বৈঠকে উপস্থিত সবাই তার প্রস্তাব সমর্থন করেন।

বহিষ্কারের বিষয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকীর প্রাথমিক সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তাকে ৭ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হবে। সে দল থেকে বহিষ্কার হলে তার সংসদ সদস্যপদও বাতিল হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কার্যনির্বাহী সংসদের এক সদস্য বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকীর ভাগ্য আগেই নির্ধারণ হয়েছিল। রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকীকে দলে রেখে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের হাতে আন্দোলনের কোনো ইস্যু তুলে দিতে চাননি। এছাড়া, আওয়ামী লীগ সরকার কখনো ইসলামবিরোধী নয়। তাই লতিফ সিদ্দিকী যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তাকে দলে রাখার কোনো অর্থ হয় না।’

হাইকোর্টের সেই রায়
১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে ডা. আলাউদ্দিন আহমেদ ও হাসিবুর রহমান স্বপন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদে এই দু’জনের সদস্য পদ থাকার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন।

হাইকোর্ট বিভাগ তখন ওই দুজনের সংসদ সদস্যপদ বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে রায়ে বলা হয়, এক দলের আদর্শ ও বিশ্বাস নিয়ে নির্বাচিত হয়ে অন্য দলের আদর্শ ও বিশ্বাস ধারণ করা নৈতিকতা বিরোধী। এটি দলের বিপক্ষেই অবস্থান। একে নীতি বিসর্জনের ঘটনা বলেও উল্লেখ করা হয়।

এর বিপক্ষে সরকার পক্ষ আপিল করলে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। এই রায়ের প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে, লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে একই কারণে আপিল বিভাগের রায় কার্যকর হতে পারে।

সংবিধানে যা বলা হয়েছে
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি ক) উক্ত দল হতে পদত্যাগ করেন, অথবা খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন তা হলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হবার অযোগ্য হবেন না।

সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়া সম্পর্কিত সংবিধানের অন্য বিধানগুলো হচ্ছে ৬৬ ও ৬৭ অনুচ্ছেদ।

৬৬ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হবার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি (ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন; (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হবার পর দায় হতে অব্যাহতি লাভ না করে থাকেন; (গ) তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন; (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে।

৬৭ অনুচ্ছেদের (১) ধারায় বলা হয়েছে (ক) ‘তার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে নব্বই দিনের মধ্যে তিনি তৃতীয় তফসিলে নির্ধারিত শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করতে ও শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করতে অসমর্থ হন (তবে শর্ত থাকে যে, অনুরূপ মেয়াদ অতিবাহিত হবার আগে স্পিকার যথার্থ কারণে তা বাড়াতে পারবেন)। (খ) সংসদের অনুমতি না নিয়ে তিনি একাধিক্রমে ৯০ বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকেন; (গ) সংসদ ভেঙে যায়; (ঘ) তিনি এই সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হোন অথবা (ঙ) এই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। (২) কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করেন তখন তার সদস্যপদ শূন্য হবে।

তবে আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, দলের সাধারণ সদস্যপদ থেকেও বহিষ্কার হলেও তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাবেন না। সে ক্ষেত্রে তিনি স্বতন্ত্র সদস্য বলে বিবেচিত হবেন। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও এই মত পোষণ করেন। বাংলামেইল২৪ডটকম

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫