Skip to content

তোরা চলে আয় আমি সমাজতন্ত্র করবো

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে নির্মমভাবে নিহত হন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন ঘাতকদের আক্রোশ থেকে রেহাই পাইনি শেখ পরিবারের কেউই। এমনকি ছয় বছরের শিশু রাসেলকেও হত্যা করা হয়েছে নির্মমভাবে। তৎকালীন বিভিন্ন ঘটনার সূত্র ধরে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট, পরিণতি এবং ইতিহাসের বাক বদল- নানা দিকে আলোকপাত করেছেন মুক্তিযোদ্ধা, কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য হায়দার আকবর খান রনো। তার বয়ানে পড়ুন সেইসব দিনের কথা:

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট যে রক্তাক্ত ঘটনাটি ঘটেছে তাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নৃশংশভাবে নিহত হলেন, এটা বলাই বাহুল্য যে আমাদের ইতিহাসে একটা দুঃখ্যজনক, বেদনাদায়ক ও ট্র্যাজিক অধ্যায়। এ ঘটনায় কেবল মাত্র বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন তাই নয়, আমাদের ইতিহাসও পিছনের দিকে টার্ন নিয়েছে।

আমি যেটা মনে করি, তাদানিন্তন কতগুলো ঘটনা, কে বা কারা ক্ষেপে আছে, অসন্তোষ ফুসে উঠছে প্রভৃতি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের শিকড়ে পৌছা সম্ভব না।

বলা হয়ে থাকে, জন অসন্তোষ, রক্ষী বাহিনী-সেনা বাহিনীর মধ্যে বিরোধ বা সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ প্রভৃতি কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আমি মনে করি, এ সমস্ত অভ্যন্তরীণ ব্যাপার- স্যাপার যাই থাকুক না কেন আসলে পুরো ব্যাপারটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পরিণতি বা ফলাফল।
কেউ কেউ বলেন এবং আমিও বিশ্বাস করি, বাহাত্তর সালে হলে কেউ সাহসই পেত না এমন ঘটনা ঘটাতে। পচাত্তর সালে কতকগুলো ঘটনার প্রেক্ষিতেই হয়তো কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। এদের মধ্যে একজন খন্দরকার মুস্তাক, যাকে বঙ্গবন্ধু খুব বিশ্বাস করেছিলেন।

যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল, তারা সবাই হয়তো এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে সবটা জানতো না। হয়তো তারা একেক জন একেক মোটিভ থেকে এ হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছে। তবে যে যে মোটিভ থেকেই করুক এ হত্যাকাণ্ড চরমভাবে নিন্দনীয়।

আমার মনে আছে, ১৯৭৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু আমাকে এবং রাশেদ খান মেননকে ডেকেছিলেন তার বাসায়। সেদিনও আমরা তাকে অবহিত করার চেষ্টা করেছিলাম যে, ‘জন অসন্তোষ কিন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে’। এবং আরও কতগুলো বিষয় অবহিত করার চেষ্টা করেছিলাম। জনঅসন্তোষ যে ছিল এটাও ঠিক। কারণ নেতা-কর্মীদের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ‘চাটার দল সব খেয়ে নেয়।’

তিনি আমাদের খুব স্নেহ করতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তোদের মতো ভালো ছেলে না আসলে কীভাবে হবে। তোরা চলে আয় আমি সমাজতন্ত্র করবো।’
আমি বঙ্গবন্ধুকে বলাছিলাম, আপনার দলে যে লোকেরা আছে তাদের নিয়ে আপনি সমাজতন্ত্র করতে পারবেন না। তিনি পারেননি, এটা সম্ভবও ছিল না।

যাই হোক, বড় বড় নেতারাও কখনো কখনো ভুল করে ফেলে। তাদের ছোট্ট একটি ভুলের জন্য অনেক বড় মাসুল দিতে হয়। আমার মতো ছোট মাপের মানুষ অনেক বড় ভুল করলে কিছু হয় না। কিন্তু বড় মাপের মানুষের ছোট্ট ভুল কারণে ইতিহাসই পাল্টে যায়।

আমার মনে আছে, যুদ্ধ চলাকালীন মওলানা ভাসানী আমাদের একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। আমরা তখন দেশের বিভিন্ন এলাকাতে যুদ্ধ করছিলাম। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, ‘প্রিয় জাফর, রনো, মেনন, আমার দোয়া লইয়ো। পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের একটা চেষ্টা চলিতেছে। তোমরা ইহা মানিয়া লইবা না?’
যধরফবৎ-ধশনবৎ-শযধহ-ৎড়হড়

কেবিনেটের মধ্যে এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে দু’টি ট্রেন্ড ছিল। একটি মুশতাক দ্বারা পরিচালিত, আরেকটি তাজউদ্দিন আহমেদ দ্বারা পরিচালিত।
কথাগুলো এজন্যই বললাম যে- যুদ্ধচলাকালীন পাকিস্তানের সঙ্গে একটা কনফেডারেশনের সমূহ সম্ভাবনা ছিল। কেউ কেউ সেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। এর মূল নায়ক ছিল খন্দকার মুশতাক। মুশতাক মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই পাকিস্তানের সঙ্গে একটা কনফেডারেশনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। আর অন্যদিকে তাজউদ্দিন আহমেদের সুদৃঢ় নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছিল।

কিন্তু দেখা গেলো যে বঙ্গবন্ধু এত বিচক্ষণ নেতা হওয়া সত্ত্বেও উনি বিশ্বাস করলেন মুশতাককে। আর তার সরকার থেকে তাজউদ্দিনকে সরিয়ে দিলেন। ইট ওয়াজ এ গ্রেট মিসটেক।

১৫ আগস্টের ঘটনার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ সাইড চেঞ্জ করলো যেটা বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে সম্ভব ছিল না। পরবর্তীতে আমরা দেখতে পেলাম, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সাইড চেঞ্জ করলো। এই চেঞ্জের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ইলজিক্যাল দিকও চেঞ্জ হয়ে গেলো। চেঞ্জ হয়ে গেলো আমাদের কনস্টিটিউশনের ভিত্তি। সমাজতন্ত্র উড়ে গেলো, স্বাধীনতার চেতনা উড়ে গেলো এবং পাকিস্তানী ধারার লোকজন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে শুরু করলো। একাত্তরে যারা সরাসরি বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল, সেই সব লোকজন মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণ করলো, গাড়িতে পাতাকা লাগিয়ে ঘুরলো।

এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতি থেকে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির উত্থান ঘটলো। ১৫ আগস্টের আগে দেশে কিন্তু সমাজতন্ত্র হয়নি বা ছিলও না, তবুও মুখে হলেও সমাজতন্ত্রের কথা বলা হতো। এমনকি সংবিধানের মধ্যেও সমাজতন্ত্রের কিছু কিছু টার্মস ছিল। পচাত্তরের পর সেগুলো আর উচ্চারিত হয় না। ইটস এ রেজাল্ট অব দ্যাট ট্র্যাজিক কিলিং।

মজার বিষয় হচ্ছে, কোনো এক কাজে আমি একটি অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে কতগুলো লোক আলোচনা করছিল যে, ‘শেখ মুজিব তো মারা গেলো। তাইলে কি এখন বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন হয়ে যাবে? নাম যদি পরিবর্তন হয় তাহলে কি নাম হবে? বাংলাদেশ পরিবর্তন হয়ে বাংলাস্তান হবে?’ আমি কিছু বলিনি, শুধু চুপ করে তাদের কথা শুনেছি। তাদের পরিচয়ও জানতে পারিনি বা তখন আগ্রহ প্রকাশ করিনি।

এখন এ ঘটনাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এটা একটা সাইকোলজিক্যাল বিষয়। ‘বাংলাস্তান’ মানে পাকিস্তান বা এর কাছাকাছি কিছু একটা। আর বাংলাদেশ হচ্ছে অন্য একটা জিনিস, এটা হিন্দুদের ব্যাপার-স্যাপার আরকি। এভাবেই একটা সাম্প্রদায়িক ইজম প্রতিষ্ঠিত হতে থাকলো।

তারপর কী হলো! বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে আমরা একটা মুসলিম বাংলাদেশ পেলাম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাইড চেঞ্জের পাশাপাশি আমরা এভাবে পাকিস্তানী শক্তিকে জায়গা করে দিলাম। এটা ছিল অনেক বড় একটা সিন্ডিকেট। হয়তো তৎকালীন এমন অনেক ছোট-খাটো ঘটনাকে একসঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা টানা যেতে পারে।

অকস্মাৎ এ ঘটনায় বামদলগুলো সব হতভম্ব হয়েছিল, হতচকিত হয়ে পড়েছিল, বামদলগুলো সবাই তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ়। আমরা বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরোধিতা করলেও, বাকশাল গ্রহণ না করলেও, আন্দোলন সংগ্রাম করলেও তাকে এভাবে মেরে ফেলা হবে কিংবা মেরে ফেলা উচিৎ একথা ভাবতেও পারিনি। কেউ বঙ্গবন্ধুকে মারতে পারে এটা আমাদের কল্পনাতেও আসেনি কখনো।

তবে আমরা আরও চমকে গেলাম, বিস্মিত হলাম যখন দেখলাম আওয়ামী লীগের লোকজন সব ওই দিনই সকালে এক এক করে মন্ত্রিসভায় শপথ নিচ্ছে। যদিও তখন আমি ছিলাম চট্টগ্রামে। টেলিফোনে যোগাযোগ করে সব খবরা-খবর জানতে পেরেছি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কারফিউ জারি করা হয়েছিল। আমি রাশেদ খান মেননকে ফোন করেছিলাম ঢাকায় আসবো কি-আসবো না জানতে। মেনন জানালো, ‘রেডিওতে কারফিউ ঘোষণা করেছে কিন্তু তার কোন রেশ তো দেখছি না। রাস্তায় সাধারণ লোকজন হাটা চলা করছে।’

বঙ্গবন্ধু হত্যার দু’দিন পর আমার এক সাংবাদিক বন্ধু ধানমণ্ডি লেকের পাশে একটি বাসায় আমাকে নিয়ে গেলো। গিয়ে দেখি সেই বাসায় কামারুজ্জামান সাহেব (জাতীয় চার নেতার একজন) লুকিয়ে রয়েছেন। তখন তিনি বলেছিলেন যে এভাবেই আত্মগোপন করে থাকবেন। কিন্তু পরবর্তীতে কেন আত্মসমর্পণ করলেন বুঝলাম না। শেষমেষ ৩ নভেম্বর কারাগারে নিহত হলেন। বাংলামেইল২৪ডটকম

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫