সাদিকুর রহমান
সারাদেশেই বিভিন্ন নদ-নদী ও হাওরাঞ্চলে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডুবে গেছে শত শত হেক্টর ফসলের জমি। কারো পাঁকা ধান আর কারো কাঁচা ধান ডুবে গেছে পানিতে। অনেক অঞ্চলে পানি বৃদ্ধির পর ফসল সংগ্রহ করা গেলেও লবনদহ ও চিলাই সংলগ্ন প্লাবিত ধান ক্ষেতের বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত পানির দ্বারা নদীর জলজ জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে এক যুগেরও বেশি আগে। এখন কৃষিক্ষাতও শেষ হওয়ার পথে। ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি ধান ক্ষেত পচন ধরায় হতাশায় ভাসছেন কৃষকেরা।
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী এলাকার কৃষক শওকত হোসাইন জানান, তিনি এবার ৪০ শতক জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেন। ফসল ভালো হয়েছে। আর কয়েকটা দিন সময় পেলে ধানগুলো পুরোপুরি পেঁকে যেত। কিন্তু হঠাৎ করে লবনদহ নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায়, নদীর বিষাক্ত পানি প্রবেশ করছে ক্ষেতে, এর ফলে পঁচে গিয়েছে জমির ধান। তার মতো আরো অনেকেরই একই দশা।
গাজীপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসিবুল হাসানের বলছিলেন, এবছর শুধু সদর উপজেলাতেই ৩৫০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে, যার প্রধান কারণ পানি বৃদ্ধি নয়, বরং নদীর বিষাক্ত পানি৷ কারণ সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে নদীর পানি বৃদ্ধি পায়, সেই হিসাবে কৃষকগণ ১৪৫-১৫০ দিনের ধানের জাত বপন করে থাকেন। কিন্তু এবার একমাস আগেই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। নদীর পানি পরিষ্কার হলে ধান গাছ গুলো নিমজ্জিত অবস্থায়ও কয়েকদিন টিকে থাকতে পারতো, কিন্তু পানি বিষাক্ত হওয়ায় ক্ষেতে পানি প্রবেশের পরই ধান গাছ পঁচে যাচ্ছে। আমি কিছু ধান ক্ষেত দেখেছি শুধু খড়ও কেটে আনার অবস্থা নেই, পঁচে দুর্গন্ধ ও প্রাণীর খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে গিয়েছে। আরো বড় সমস্যা এই বিষাক্ত পানিতে শ্রমিকরা ধান কাঁটতে চান না, পানিতে নামলে তাদের ত্বক ক্যামিকেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসনকেও অবহিত করেছি। আমি মনে করি কারখানার ইটিপি’র সঠিক ব্যবহারের কোন বিকল্প নেই৷ আর এই ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকার কোন বিকল্প নেই।
“বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল” গাজীপুর সদর উপজেলা শাখার সভাপতি কলকারখানার দূষণের সাথে যোগ করে বলেন, নাগরিক বর্জ্যও এখন সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। পলিথিন, প্লাস্টিক সহ বিভিন্ন অপচনশীল বর্জ্য নদীতে ফেলায় তা বর্ষায় ছড়িয়ে পরছে কৃষি ক্ষেতে, যা পরবর্তী চাষে সৃষ্টি করে দারুন প্রতিবন্ধকতা। নদী দূষণ প্রতিহত না করা গেলে এসব এলাকার ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন চাষীরা।
সদর উপজেলা সিনিয়ার মৎস্য কর্মকর্তা জান্নাতুন শাহিনও বলছিলেন কারখানার ইটিপি’র সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কথা। নদীতে মাছ ও জলজ প্রাণীদের বসবাস উপযোগিতা করতে নদীকে দূষণ মুক্ত করতে হবে৷ জেলা প্রশাসকের মারফত যতদূর জেনেছি লবনদহ নদীটি পুনঃখনন হতে পারে৷ তিনি আরো বলেন, কল-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোন বিকল্প নেই, নয়তো একসময় এই এলাকার প্রাকৃতিক মাছের অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (BRRI) এর irrigation and water management বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলছিলেন, কলকারখার এড়িয়া ভিত্তিক ব্যবস্তাপনার কথা। সুনির্দিষ্ট শিল্প এলাকা ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া নদী দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়৷ আর নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে দূষিত নদী ও বিলের পার্শ্ববর্তী ধান চাষীদের আগ্রহ ধরে রাখা যাবে না। তাছাড়া অন্যান্য সময়ের তুলনায় এবছর নদীর পানি আগেই বাড়তে শুরু করায় অনেক ধান ক্ষেতের পরিপক্কতা আসার আগেই নদীর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। অবশ্য নদীর পানি দূষণ মুক্ত হলে ক্ষতির পরিমান অনেকটাই কম হতো। কারণ সাধারণত বিলের পানির নিচেও ধান গাছ বেশ কয়েকদিন বেঁচে থাকলেও, নদীর পানি বিষাক্ত হওয়ায় ধান গাছ তো দ্রুত মারা যাচ্ছে এবং খড়ও পঁচে গিয়ে প্রাণি খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে।
ওই এলাকার পরিবেশকর্মীরাও মনে করেন, নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষি ও জলজ জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে নদীর দূষণ রোধের কোন বিকল্প নেই, অন্যথায় প্রান্তিক কৃষি সহ প্রাকৃতিক মাছের অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যেতে পারে।
