Skip to content

টাকা দিলেই মেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ!

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ শিক্ষার নামে যেন প্রতারণার জাল পেতেছে। যেখানে টাকা দিলেই মেলে সনদ। বিশ্ববিদ্যালয়টি সনদ বাণিজ্য চালিয়ে যেতে রাজধানীসহ সারাদেশে পরিচালনা করছে শতাধিক অবৈধ ক্যাম্পাস। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কোনো অনুমোদন নেই এসবের। এসব ক্যাম্পাসে ভুয়া তথ্য দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। ফলে উচ্চ শিক্ষা শেষ করেও হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন হয়ে পড়ছে বিপন্ন।
সনদ বাণিজ্য, অবৈধ ক্যাম্পাসসহ নানা অভিযোগ থাকার পরও বারবার উদ্যোগ নিয়ে বন্ধ করা যায়নি বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ ইউজিসির গণবিজ্ঞপ্তিতে এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি না হতে সাবধান করা হয়েছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করেও কাজ হয়নি। ওই তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘প্রতিষ্ঠানটি অর্থের বিনিময়ে সনদ বিক্রি করছে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘন করেছে।’ এরপরও বিশ্ববিদ্যালয়টির মালিকানা দাবিদাররা আইনের ফাঁকফোকর ও স্থগিতাদেশ নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
সর্বশেষ ইউজিসির গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য অননুমোদিত শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। এসব ক্যাম্পাস বন্ধের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির নির্দেশক্রমে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে—যা প্রক্রিয়াধীন।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মামলার ফাঁদের কারণেই সরকার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বর্তমানে চারটি পক্ষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা দাবি করে অবৈধ ক্যাম্পাস চালাচ্ছে। এই চারটি পক্ষই আলাদা আলাদা সনদপত্র দিচ্ছে এবং চারটি পক্ষের অন্তত ১০টি মামলা থাকার কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ওই মামলার ফাঁক গলেই প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ শিক্ষার নামে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন গ্রুপের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বর্তমানে সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়টির ১২০টির বেশি ক্যাম্পাস রয়েছে। রাজধানীর ফার্মগেট, উত্তরা, খিলগাঁও, গোড়ান ইস্টার্ন হাউজিং, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী, পান্থপথ, মিরপুর, মালিবাগ, রামপুরা, মৌচাক, মতিঝিল, পল্টন, মগবাজার, বাড্ডা, টঙ্গী, মুগদাসহ বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে অর্ধশত ক্যাম্পাসে সনদ বাণিজ্য চলছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে হবিগঞ্জ, বগুড়া, খুলনা, কুমিল্লা, দিনাজপুর, রাজশাহী, পঞ্চগড়, মাগুরা, ঝিনাইদহ, জামালপুর, রাজবাড়ী, সাতক্ষীরা, খুলনা, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরে প্রতিষ্ঠানটির অবৈধ ক্যাম্পাস রয়েছে। এসব ক্যাম্পাসের বড় একটি অংশের মালিকানা দাবিদার হচ্ছেন আকবর উদ্দিন আহমদ গ্রুপ ও আবুল হোসেন গ্রুপ। এছাড়া এসআই খান গ্রুপ ও এএ ফজলে রাব্বীও দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি ও ট্রাস্টের দাবিদার। তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ওয়েবসাইটে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে তাতে প্রধান ক্যাম্পাসের ঠিকানা হচ্ছে বাড়ি-২১, সড়ক-৯/এ, ধানমণ্ডি। ইউজিসি বলছে, এটিই দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস। এছাড়া বাকি ক্যাম্পাসগুলো অননুমোদিত ও অবৈধ।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি সাময়িক অনুমোদন পায়। তখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দারুল ইহসান ট্রাস্ট’ নামে একটি ট্রাস্টি বোর্ড ছিল। ট্রাস্টের সেক্রেটারি ছিলেন সৈয়দ আলী নকী। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন ছয়জন। পরে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়।
আরও জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যাত্রার প্রথমদিকে অধ্যাপক আলী আশরাফ, অধ্যাপক আলী আহসান, অধ্যাপক আবদুল হামিদ, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ভিসির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে প্রফেসর আলী নকীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগদানের জন্য ট্রাস্টের সুপারিশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এমতাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল হক রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগপত্র নেন। এই নিয়োগের বিরুদ্ধে অধ্যাপক আলী নকী হাইকোর্টে রিট করেন। হাইকোর্ট ডিভিশন সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করেন। পরে আইন ও নিয়ম মোতাবেক দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন অধ্যাপক আলী নকী। ২০০৮ সালে অধ্যাপক আলী নকী মারা গেলে প্রফেসর আকবর উদ্দিন আহমেদ ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসির দায়িত্ব পান। ২০১০ সালে আবুল হোসেন এবং সাব্বির হাসান নিজেদের দারুল ইহসান ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি দাবি করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।
অননুমোদিত ক্যাম্পাস পরিচালনা ও সনদ বাণিজ্য নিয়ে জানতে মালিকানা দাবিদার আবুল হোসেনের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। মালিকদের আরেকটি পক্ষ আকবর উদ্দিন আহমেদ ট্রাস্টির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বনি আমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন মালিকানা সমস্যা, কিছু খারাপ লোক ও শাখা পরিচালকদের অনিয়মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। আসলে মালিকানা নিয়ে সমস্যা মূলত দুটি গ্রুপের। এ সমস্যাটা সমাধান হতে যাচ্ছে। আমরাও চাই এ সমস্যার সমাধান হোক।
এ ব্যাপারে ইউজিসির চেয়ারম্যান ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘বিতর্কিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি না হওয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য আমরা ফাইট করছি। আর অবৈধ ক্যাম্পাসগুলো বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছে। বিতর্কিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ করা হলেও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে তাদের ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ রাখা হবে বলেও জানান তিনি।’
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ বিষয়ে বলেন, শিক্ষার নামে সনদ বাণিজ্য বন্ধে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আইন মানছে না তাদের আইনের আওতায় আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে ইতোমধ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনুমোদন বাতিল করা হবে।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫