বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬’ মন্ত্রিসভা অনুমোদন করার পর থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে আইনটি সামাজিকভাবে বাল্যবিয়ে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আইনটির বিশেষ বিধানের সমালোচনা করে এর অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ, নারী নেত্রী ও জনপ্রতিনিধিরা। তারা মনে করেন, আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাল্যবিয়ে বৈধতা পেতে পারে।
বাল্যবিয়ের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান দেশগুলোতে। ভারত, ইথিওপিয়া ও নাইজেরিয়ায় ১৫ বছর পেরুনোর আগেই প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়। বাংলাদেশ, নেপাল, নাইজার, শাদ (চাদ), মালি, মোজাম্বিক ও উগান্ডায় ৫০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। বাল্যবিয়ে বাংলাদেশে ১৯২৯ সাল থেকে অবৈধ? বাংলাদেশে শতকরা ৬৫ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়সের আগেই?
ইউনিসেফের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার সারাবিশ্বে সর্বোচ্চ? বাংলাদেশে শতকরা ২৯ ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় ১৫ বছরের কম বয়সে? এর মধ্যে শতকরা দুই ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১১ বছরেরও কম বয়সে?
গত ২৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬’-এর খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে, তাতে বিশেষ ক্ষেত্রে বিয়ের প্রসঙ্গটি ১৯ ধারায় উল্লেখ করা হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ১৮-এর নিচে কত বছর বয়সে বিয়ে হতে পারে, আইনে তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। ১৯২৯ সালের বাল্যবিয়ে-সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি পুনর্বিন্যাস ও বাংলায় রূপান্তর করা হয় এবং আইনে বিভিন্ন অপরাধের আওতা ও সাজার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
জাতীয় প্রেসক্লাবের হলরুমে ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সুলতানা কামাল মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৬ প্রত্যাহারের দাবি জানান। তিনি মন্তব্য করেন, ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ ১৮-এর নিচে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যাবে এটা সাংঘর্ষিক। মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া এ আইন আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এছাড়া অবিলম্বে এ আইন পরিবর্তনের দাবি করছি। কেননা বাল্যবিয়ে ক্রমশ বাড়ছে। এমতাবস্থায় পাস হওয়া এ আইনের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে রোধ নয় বরং আরও বাড়বে। এছাড়া নারীর উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু নারীরা যদি প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হতে থাকেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার পাওয়া উপহাসে পরিণত হবে।
ভিন্নমত প্রকাশ করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতেই পারে। কোনো ঘটনা ঘটলে আদালত ও বাবা-মায়ের সম্মতি থাকলে তবেই বিয়ে হতে পারে। তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধ করলেও কিশোর-কিশোরীদের প্রেম বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটি নয়। কোনো কিশোরী পরিস্থিতির শিকার হয়ে গর্ভবতী হলে, তখন তার ভবিষ্যৎ কী হবে? অভিভাবকহীন প্রতিবন্ধী কিশোরীর থাকার জায়গা না থাকলে ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে মেয়েটিকে ভালোর জন্য বিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রগুলো আইনের বিধিতে সুনির্দিষ্ট করা থাকবে বলে তিনি জানান।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘আইনের খসড়ায় বিশেষ ধারা যুক্ত করায় আমি হতাশ ও ক্ষুব্ধ। নারীর ক্ষমতায়নে দেশ সামনে এগোচ্ছে বলে আমরা দাবি করছি, এ বিষয়টির সঙ্গে বিশেষ ধারা সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন সংবাদমাধ্যমকে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের বয়স ১৮ বছর রাখার সিদ্ধান্ত সঠিক। তবে আইনে এমন কোনো জায়গা রাখা ঠিক হবে না, যাতে সুযোগ সন্ধানীরা তা কাজে লাগিয়ে কিশোরীদের বিয়ের নামে নির্যাতন করতে পারে।
আইনের ১৯ ধারায় উল্লেখিত বিশেষ বিধানের ব্যাখ্যা সম্পর্কে সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, বিশেষ প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশ ও মা-বাবার সম্মতিতে অনুষ্ঠিত বিয়ে বিধির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বলেন, অবিবাহিত মা বা অন্য কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার বেলায় এ বিধান প্রযোজ্য হবে।
আইনটিতে বাল্যবিয়ের সাজা সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়, বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত বিষয়ে কেউ মিথ্যা অভিযোগ করলে ছয় মাসের কারাদ- বা ৩০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ- হতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বা মেয়ে বাল্যবিয়ে করলে তাদের ১৫ দিনের আটকাদেশ ও অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে বিয়ে করলে দুই বছর কারাদ- বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। মা-বাবা আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড দেওয়া যাবে। বিয়ের আয়োজনের সঙ্গে জড়িত কাজি, রেজিস্ট্রার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আইন না মানলে দুই বছর কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তি দেওয়া হবে।
ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত মামলার বিচার অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধের মতোই হবে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত বিচার করতে পারবেন। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী, আদালত নিজ উদ্যোগে বা কারও অভিযোগের ভিত্তিতে বাল্যবিয়ে থামিয়ে দিতে পারবেন। বাল্যবিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তা পুনর্বিবেচনা করতে পারবেন আদালত। আমাদের সময়.কম
