স্টাফ রিপোর্টার ॥
ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের গুরুত্বপূর্ণ ৬৫টি গোপন নথি একটি পোশাক কারখানার অফিস কক্ষ থেকে উদ্ধার হয়। নথি পাচার রহস্য উন্মোচনে গঠন করা হয় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। কিন্তু তিনমাসেও রহস্যের ঝট খুলেনি। এবার শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পাশাপাশি এবার অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রহস্য উন্মোচনে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সঙ্গে দুদক স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে। এ সংক্রান্ত আদেশের নথি নং- দুদক/১০-২০১৭/অনু: ও তদন্ত-২/চট্টগ্রাম।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের গুরুত্বপূর্ণ ৬৫টি নথি চট্টগ্রামের নয়াবাজার বায়েজিদ বোস্তামীতে অবস্থিত আল আমীন মেরিটাইম ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনা সম্প্রতি কমিশন থেকে অনুসন্ধানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য চট্টগ্রাম পরিচালক সম্প্রতি একজন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও একজন তদারকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে কমিশন বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে।
এদিকে কাস্টম হাউসের গোপন নথি উদ্ধারের ওই ঘটনাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে গত ডিসেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বর্তমানে এর তদন্তকাজ এগিয়ে চলছে।
প্রাথমিক তদন্তকাজ শেষ হয়েছে বলে ড. মইনুল খান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা এর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তৎপর আছি। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আইনী পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবো।
যদিও চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার এ এফ এম আবদুল্লাহ থান তথি গায়েবের কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিজস্ব কোনো আইনজীবি নেই। আমরা বাইরের আইনজীবিদের দিয়ে কাজ করাই। এ রকম এক আইনজীবিকে কাস্টসের কোন আইনী সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দেওয়া হয়েছিল। হঠাৎ ওই আইনজীবি মারা যান। পরবর্তীতে পোশাক কারখানা থেকে নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। আমাদের তদন্তে জানতে পেরেছি ওই প্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষ আইনজীবি অফিসিয়াল কাজ করতে ব্যবহার করতেন। একারণে নথিপত্রগুলো পোশাক কারখানায় পাওয়া যায় কিংবা উদ্ধার করা হয়। এ বিষয়ে আরো তদন্ত চলছে। ভবিষ্যতে আমরা আরো সতর্ক থাকবো।
এদিকে অর্থ পাচার সংক্রান্ত শুল্কায়ন নথি বা করনথি গায়েব হওয়ার ফলে অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলার তদন্ত কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এনবি আর। বিষয়টিকে ‘বিপজ্জনক’ বলছে প্রতিষ্ঠানটি। এনবি আরের অন্যান্য অফিসে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এনবি আর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মিরপুরের পবর্তার মেসার্স এসএন ডিজাইনের ২৯৭টি (সাতটি চালান রফতানির প্রক্রিয়াধীন) পণ্য চালান জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রফতানিপূর্বক বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসিত না হওয়ায় অর্থাৎ রফতানিতে সঠিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা না আসায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মতিঝিল থানায় ফৌজদারি মামলা করে। এই মামলার তদন্তভার শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. নাসিদুল হকের ওপর অর্পণ করা হয়। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতকে জানান, তদন্ত কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য আলোচ্য পণ্য চালানগুলোর শুল্কায়ন নথি পর্যালোচনা করা দরকার। এ লক্ষ্যে তদন্ত কর্মকর্তা দু’বার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে যান। কিন্তু প্রতিবারই শুল্কায়ন সংক্রান্ত নথিগুলো পাওয়া যাচ্ছে না বলে কাস্টম হাউস থেকে ওই তদন্ত কর্মকর্তাকে জানানো হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট নথিগুলো জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া এর আগেও বিভিন্ন সময়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর থেকে নথি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে। কিন্তু নথি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবারই শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরকে জানানো হয়েছে। ফলে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় মামলাটি তদন্তের জন্য নথিগুলো এই দফতরের তদন্ত কর্মকর্তা কর্তৃক জব্দকরণ এবং নথি গায়েবের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্য এনবি আরে অনুরোধ করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর নয়াবাজারে আল-আমিন মেরিটাইম ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেলস ফ্যাশন নামের পোশাক কারখানা থেকে ৬৫ গোপন নথি উদ্ধারের পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দিনভর কাস্টম হাউসে ছিল নানা গুঞ্জন। কাস্টমসের মতো সুরক্ষিত এলাকা থেকে এসব গোপন নথি কিভাবে পোশাক কারখানায় গেল, কী উদ্দেশে কারা নিল, এর সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাদের কেউ জড়িত আছেন কিনা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, কাস্টম হাউস থেকে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব সংশ্লিষ্ট অনেক ফাইল এভাবে গায়েব হয়ে গেছে।
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টম হাউস থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার নয়াবাজারে আল-আমিন মেরিটাইম ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেলস ফ্যাশনে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দার একটি দল। অভিযানে ওই প্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষের আসবাবপত্রের ভেতর থেকে কাস্টমসের ৬৫টি গোপন নথি উদ্ধার করা হয়। এসব নথির মধ্যে ১১টি নথি ব্যাংক গ্যারান্টিসংক্রান্ত, ৪৩টি নথি বিচারাধীন বিভিন্ন মামলার এবং ১২টি নথি শুল্কায়ন ও অন্যান্য সংক্রান্ত। প্রাথমিকভাবে তিনটি নথি পরীক্ষা করে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
এ ব্যাংক গ্যারান্টি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে, নাকি তা কেউ তুলে নিয়েছে সে বিষয়েও তদন্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রটি আরও জানায়, যে পোশাক কারখানা থেকে কাস্টম হাউসের গোপন নথি জব্দ করা হয়েছে ওই কারখানার মালিক মো. আল আমিন। এসব নথি কিভাবে ওই কারখানার অফিসে গেল- জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। কাস্টম হাউসের এসব নথিতে এআইআর থেকে শুরু করে কাস্টমস কমিশনারেরও স্বাক্ষর রয়েছে।
এর বেশ কয়েক মাস আগে শীর্ষ পর্যায়ের ৪ দালালকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এরা কতিপয় সিএন্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে জোগসাজশ করে কাস্টমস হাউসে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছিলেন। এর সঙ্গে গোপন নথি বাইরে যাওয়ার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
