দিপংকর রায় দিনাজপুর থেকে:
অভাবের কারনে লেখাপড়া ছেড়ে বাবার ঋনের টাকায় কেনা ট্রাক্টর শ্রমিক এখন ইংলিশ ম্যান। আর এই ট্রাকের প্রতিদিনের অর্থেই চলে পুরো পরিবার। বলছি বোচাগঞ্জ উপজেলার সাধুপাড়া গ্রামের সুধীর চন্দ্র ও রাধা রানী দম্পতির ছোট ছেলে হৃদয়ের কথা। সারা দিন ট্রাক চালিয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে পরিবারের অন্ন জোগান তিনি। পাশাপাশি নিজেকে অদম্য করেছেন ইংরেজি শেখা ও নেশার প্রবল ইচ্ছা শক্তি। উচ্চ শিক্ষা না থাকলেও ট্রাক ড্রাইভার হৃদয় এখন ইংরেজিতে কথা বলেন অনর্গল।
এলাকায় বর্তমানে এই ইংলিশ ম্যান ট্রাক চালক রীতিমত বনে গেছেন অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলা অদম্য ইচ্ছা শক্তির নায়ক। তারই গল্প শুনতে আর ইংরেজিতে কথা বলতে ছুটে গেলেন দিনাজপুর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এস এম হবিবুল হাসান। বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফ হোসেনের কক্ষে কথা বললেন ইংরেজিতে সাথে উপহার হিসেবে দিলেন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ আর মহামূল্যবান কিছু বই। অভাবের তাড়নায় থেমে যাওয়া পড়া লেখার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন উপজেলা প্রশাসনের হাতে। দেশের বাহিরে যাওয়া জনশক্তির অধিকাংশ মানুষের প্রধান সমস্যা ইংরেজি ভাষার দক্ষতা। ইংরেজিতে কথা বলার এই দক্ষতা ছড়িয়ে দিয়ে শ্রমিকের ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর তমকাও দিলেন হৃদয়কে।
যে গল্প শোনালেন ইংলিশ ম্যান ২০১৮ সালে এস এস সিতে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৪.৮৫ এবং ২০২০ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৮৩ পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকে ভর্তি হয়ে দারিদ্র্যতায় বন্ধ হয় তার লেখা পড়া। এরপর পরিবারের অভাব মিটাতে শ্রমিক হয়ে বেছে নেন বাবার শেখানো ট্রাক ড্রাইভারের পেশা। সংগ্রাম শুরু মূলত মহামারি করোনা থেকে, তবুও থামিয়ে রাখেননি ইংরেজি শেখার মনের সুপ্ত বাসনা। শুরু করেন ইংরেজিতে পারদর্শীর কথা বলা মানুষ, সংবাদ পত্র ও টেলিভিশনে ইংরেজি সংবাদ শোনা। এভাবেই ভাষাটা টুকটাক আয়ত্তে নেন হৃদয়। নিজের হাতে থাকা মোবাইল ফোনেরও যথাযথ ব্যাবহার করে দেখেন ইউটিউব আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইংরেজি টক শো। এভাবেই নিজের ট্রাক্টর নিয়ে ক্ষেপ মারতে যাওয়া আর বিভিন্ন কাজের ফাঁকে, শুরু করে নিজেই কন্টেন্ট তৈরীকরে ফেসবুকে আপলোড করা। এভাবেই এলাকার লোকজনের কাছে হয়ে উঠেন ইংলিশ ম্যান। এখন অনেকেই আসেন তার কাছে ইংরেজি শিখতে চর্চা করতে। বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফ হোসেন জানালেন ইংলিশ ম্যান হৃদয়ে বন্ধ থাকা লেখাপড়া যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন। তারউপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইংরেজিতে লারনিং করার জন্য একটি ঘর বন্দবস্ত করে দেওয়া হয়েছে।
দিনাজপুর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এস এম হবিবুল হাসান জানালেন ইংলিশ ম্যান হৃদয় ইতিমধ্যেই সবার মন জয় করে নিয়েছে। লাখো তরুণীর স্বপ্ন হয়ে অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও সে কাজ করতে পারে।
যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তাদের বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে হৃদয়। দেশের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে শ্রম বাজার। শুধুমাত্র ভাষাগত কারণেই আমরা বাজার হারিয়ে ফেলি অনেক সময়। তরুণরা যদি এই হৃদয়ের মত মোবাইলকে পজিটিভ ব্যবহার করে। ইংরেজিতে লার্নিং স্পোকিং আয়ত্ত করতে পারলে। আমরা বিশ্বের শ্রম বাজারে অনেক এগিয়ে যেতে পারবো।
