★ আওয়ামী পন্থীদের পুনর্বাসন ও দূর্নীতির মাস্টার মাইন্ড কৃষি সচিব এমদাদুল্লাহ মিয়ান
বিশেষ প্রতিবেদন
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে গত বছরের ৫ আগস্ট। এর তিনদিন পরই যাত্রা শুরু হয় অন্তর্বর্তী সরকারের। এরপর সাড়ে আট মাস অতিবাহিত হলেও স্বৈরাচারী দোসরদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং দেশে অন্তর্ঘাতমূলক পরিস্থিতি তৈরিতে চলছে নানা অপতৎপরতা। এতে ইন্ধন দিচ্ছে সরকারের নিযুক্ত আওয়ামী-ভারতপন্থী আমলারা। পতিত স্বৈরাচার হাসিনা ও তার দোসরদের পুনর্বাসন ও হাজার কোটি টাকা লোপাটের পাহাড়সম অভিযোগ কাধে নিয়ে এখনো বহাল তবিয়তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ এমদাদুল্লাহ মিয়ান। ফ্যাসিবাদ বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দের অভিযোগে জানা যায় মাঠপর্যায়ে প্রকল্প অনুমোদন, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকলেও তিনি এখনো দায়মুক্ত। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট কি তাকে দায়মুক্ত করেছে-সে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। বর্তমানে কৃষি সচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকা এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের বিরুদ্ধে কৃষি প্রশাসনে দলীয় পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে। কৃষি সচিব মিয়াদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দের ব্যানারে গত রবিবার টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে সচিব মিয়ানের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। মিয়ানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন, মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন ও নিয়োগে তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এর সময় আওয়ামী সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া যেসব আমলা বিবৃতি ও সভা-সমাবেশে অংশ নেন, তাদের অনেকেই পরবর্তীতে পুনর্বাসিত হন। তাদের সবাই আত্মগোপনে থেকে এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের ছত্রচ্ছায়ায় পুনর্বাসিত হয়েছেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে গণঅভ্যুত্থানের বিপক্ষে অংশ নেওয়া কথিত স্বৈরাচারের দোসরদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পদায়নের বিষয়টি স্পষ্ট।
তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী বাস্তবায়নের জন্য ২০২০ সালে কমিটি গঠন করে সরকার। এ কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ আমলা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। এ কমিটিকে সহায়তা করতে ওই বছরের ২৬ জানুয়ারি দায়িত্ব প্রদান করা হয় মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তা ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে। কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী ছাত্রহত্যা মামলায় কারাগারে থাকলেও এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এখন আছে একটি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে। অথচ মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারা দেশে ১০ হাজারের বেশি ম্যুরাল, স্নারক ও স্থাপনা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা এবং দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে।
ড. মিয়ান ছিলেন প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম। তিনি বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয়ে তিনি একই ধরনের দলীয় পক্ষপাত ও আমলাতান্ত্রিক স্বার্থে পরিচালিত নীতি অনুসরণ করছেন। দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। এই তদন্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা এবং তৎকালীন মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর নাম এসেছে। কামাল আবদুল নাসের বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
বিগত সরকারের সুবিধাভোগীদের কারণে কার্যত সারাদেশে পতিত ফ্যাসিবাদ সমর্থিতরা পুনর্বাসিত হচ্ছে। সরকারের নানা কর্মকান্ড কৌশলে তারা ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। সচিবালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠদের কাছে সহসাই পৌঁছে যাচ্ছে। বিগত বড় বড় দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র সরিয়ে ফেলারও অভিযোগ উঠেছে।
এমদাদুল্লাহ মিয়ানে বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে গত ২৪ শে মার্চ লিখিত অভিযোগ করে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন। অভিযোগ উঠে মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের নামে প্রায় ২০০ কোটি টাকা খরচ করেন তিন। নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদ্মাসেতু ও গোপালগঞ্জভিত্তিক কয়েকটি প্রকল্প কোনরূপ সম্ভাব্যতা যাচাই ব্যতিরেকেই অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে বিশেষ সম্পর্ক ও স্বীয় প্রভাব খাটান। তিনি গাজীপুরে “রহিমা-ফজল মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ” নামে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারী উন্নয়ন তহবিল থেকে নানা প্রক্রিয়ায় প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেন।
ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের মিশনে যেনো খুব তড়িঘড়ি করে বসছেন কৃষি সচিব এমদাদুল্লাহ মিয়ান। তিনি তার অধীনস্থ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরসমুহে আওয়ামী পন্থী ৪ আগষ্ট শান্তি মিছিলে অংশগ্রহনকারী কর্মকর্তাদের পদায়ন করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পসমুহে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট এর দোসর কর্মকর্তাদের বহাল রেখেছেন। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পাট গবেষনা ইনস্টিটিউট, এসআরডিআই, বিনা, বিএআরসি, ইক্ষু গবেষনা ইনষ্টিটিউটে ৪ আগষ্ট শান্তি মিছিলে অংশগ্রহনকারী আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এছাড়া সকল দপ্তর সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফ্যাসিস্টের দোসরদের বহাল রেখেছেন। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি থেকে আগষ্ট এর পরে পদায়নকৃত ফ্যাসিবাদ বিরোধী কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিচ্ছেন। ডিএইর মাঠ পর্যায়ের অনেক পদ খালি থাকলেও তিনি সেখানে পদায়ন করছেননা। ফলে কৃষি সেক্টরে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে মাঠে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরীর চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি ডিএই তে কর্মরত ১৯ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেন যেখানে আওয়ামীপন্থী ১০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হলেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সিনিয়র ৫ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করেছেন।
ফ্যাসিস্টের সহযোগীরা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে থেকেই এসব অপতৎপরতায় ইন্ধন যোগাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। এসব কর্মকর্তারাই একতরফা নির্বাচনের কুশীলব ছিলেন। একই সঙ্গে ফ্যাসিস্টের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে ছিলেন সদা তৎপর। বিনিময়ে নিজেরা হয়েছেন সম্পদশালী। জুলাই বিপ্লবের পরও তাদের অবস্থার নড়বড়ে হয়নি। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ফ্যাসিস্টের সহযোগীদের অপসারণের দাবি ওঠলেও সরকার এ ব্যাপারে নির্বিকার। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠেছিল ফ্যাসিস্টের সহযোগীদের খুঁটির জোর কোথায়?
কথিত স্বৈরাচারের দোসর খ্যাত সচিব এমদাদুল মিয়ান এর বিষয়ে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ডক্টর মোঃ আসাদুজ্জামান রিপন বলেন ” কৃষি সচিব মিয়ানের মতো মহা দুর্নীতিবাজার দেখি নাই, শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহচর হয়েও এরা কিভাবে এখনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন”
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ বাবুল বলেন ” এখনো স্বৈরাচারীর দোসর মুক্ত হয়নি সচিবালয়, না হলে বঙ্গবন্ধু শতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইমদাদুল্লাহ মিয়ান কিভাবে কৃষি সচিব হয়”
গত বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনের এক উপ পরিচালক নাম না প্রকাশের শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, বঙ্গবন্ধু শতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও বর্তমান কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ডঃ মুহাম্মদ এমদাদুল্লাহ মিয়ান এর বিরুদ্ধে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম তুহিনের লিখিত এক অভিযোগ আমলে নিয়েছে দুদক। তিনি আরো জানান অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে এবং এ ব্যাপারে বিস্তর অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
