Skip to content

অকৃতজ্ঞ তারেকের বহুমুখী প্রতারণা

সাভারের কলমা ঘুরে এসে রাশেদুল হক:

কিডনি কাণ্ডে আলোচিত নারী টুনির পরকীয়ার কথা কেউ বলেনি, তবে তারেকের নেশা, মাদক, প্রতারণার কথা খোলামেলা ভাবেই তুলে ধরেছেন এলাকাবাসী। জানিয়েছেন, কিডনি জটিলতায় দীর্ঘ অসুস্থতায় বছরের পর বছর ধরে অতিমাত্রার ওষুধ সেবন, ব্যক্তি জীবনের বিপর্যয়, অতিরিক্ত মাদকাসক্তিতে তারেক মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যাকে তাকে সন্দেহ করা, অসম অভিযোগ উত্থাপন আর কথায় কথায় মিথ্যা বলা তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
টুনির মতো সজ্জন, স্বামীভক্ত, ভালো মেয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা গুজব ছড়ানোর ঘটনায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী খুঁজে ফিরছেন তারেককে। তারা সমুচিত জবাব দিতে দল বেধে বেধে পাহারাও বসিয়েছেন। অবস্থা বেগতিক দেখে এলাকা ছেড়ে তারেক গা ঢাকা দিয়েছে, অবস্থান করছে অজ্ঞাত স্থানে।
রাজধানী থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরের সাভার পেরিয়ে সিএন্ডবি বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে পূর্বদিকে ৩ কিলোমিটার রাস্তা পেরোলেই ১ নং কলমা গ্রামের অবস্থান। শিল্প-কারখানা, বসতবাড়ী আর কৃষিজমি নিয়েই এই গ্রাম। যেখানে বাস করতেন তারেক-টুনি দম্পতি, তাদের দিব্য ভিলা বাড়ীর সামনে দাড়াতেই এগিয়ে আসেন স্থানীয় কয়েকজন। তারা এসে প্রথমেই ক্ষোভ ঝারেন সাংবাদিকদের উপর।
ঘটনার অনুসন্ধানে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, স্বামী তারেকের পরকীয়া, মাদকাসক্তি, প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন টুনি।
তারেক-টুনি দম্পতির বাড়ীর ভাড়াটিয়া, প্রতিবেশী তাদের উভয়ের পরিচিত ব্যক্তি, কলমা-১ বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপকালে বেরিয়ে আসে টুনির স্বামীর অকৃতজ্ঞতা, প্রতারণা, পরকীয়া, অর্থলোভী মানসিকতার নানাবিধ তথ্য।
টুনির সাথে বিয়ে হবার আগে মালয়েশিয়াতে প্রবাসী হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন মোঃ তারেক একজন চাইনিজ নারীকে বিয়ে করেন এবং তাদের সে ঘরে একটি পূত্র রয়েছে। দেশে ফিরে ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী তারেক টুনির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার সময় তারেক ও তার পরিবারের সদস্যরা এ তথ্য গোপন করে। ২০০৮ সালে টুনি প্রথম জানতে পারে তারেকের কিডনির সমস্যা রয়েছে। পরবর্তীতে ভারতের হাসপাতালে দীর্ঘপ্রায় ১০ বছর ধরে চিকিৎসা করিয়েও পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায়, ডাক্তার পরামর্শ দেন কিডনি প্রতিস্থাপন করার। ডাক্তার তারেক ও টুনির সাথে মজার ছলে জানান অপারেশনের পর তারেক পঁচিশ বছরের যুবকের ন্যায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। একবুক আশা নিয়ে স্বামীর প্রতি মায়া, ভালোবাসা, একমাত্র পুত্র দিব্যকে নিয়ে সুখের সংসারের স্বপ্ন দু’চোখে বাসা বাধে টুনির। কিন্তু কোথাও সময়মতো উপযুক্ত কিডনি না পাওয়ায়, একজন রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের কিডনি ম্যাচ করার পরও তা দিতে অসম্মতি জানানোয়, তাৎক্ষণিকভাবে টুনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নিজের কিডনি দান করে মৃত্যুপথযাত্রী স্বামীকে বাঁচিয়ে তোলার। সিদ্ধান্ত মোতাবেক নিঃস্বার্থভাবে তিনি কিডনি দান করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যা স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরে! কিন্তু সুস্থ হয়ে তারেক টুনির অবদানকে স্বীকারতো করেই না উল্টো তাকে বিভিন্নভাবে মানসিক যন্ত্রণা দিতে থাকে। টুনি ভেবে পান না তারেকের এমন আচরণ করার নেপথ্য কারণ। এক পর্যায়ে সব কিছু জেনে যায় টুনি। স্বামী তারেক পরকীয়ায় লিপ্ত, গোপনে তারা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। টুনির মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে।
এ সংক্রান্ত বিষয়ে টুনির হাতে বিভিন্ন তথ্য প্রমানাদি চলে আসে। তারেকের কাছে জানতে চাইলে সে তা অস্বীকার করে এবং মারমুখী আচরণ করে, টুনির বিরুদ্ধে পরকীয়ায় জড়ানোর মিথ্যে অপবাদ দেয়।
স্থানীয়দের সাথে এ নিয়ে আলাপকালে তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানায়, টুনির মতো একজন স্বামীভক্ত, পরোপকারী, সজ্জ্বন ভালো মেয়ের বিরুদ্ধে তারেক যে কথা বলে বেড়াচ্ছে তা একমাত্র অকৃতজ্ঞ, বেঈমানের পক্ষেই সম্ভব। যে মেয়ে তার স্বামীকে কিডনি দিয়ে বাঁচিয়ে তুলে, সে মেয়ে কখনোই অন্যত্র পরকীয়ায় জড়াতে পারে না। তারেক নিজের পরকীয়ার ঘটনা ধামাচাপা দিতেই, উদ্দেশ্যপ্রণাদীতভাবে এমন নোংরামী করছে। মাদক ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ হবার উপক্রম হওয়া ছাড়াও প্রচন্ড সন্দেহবাতিক হয়ে পড়েছে তারেক। স্থানীয় সম্মানী ব্যক্তিদের নিয়েও বাজে মন্তব্য করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না সে।
তারেক-টুনির পরকীয়া কাণ্ড নিয়ে একাধীক মিডিয়া সংবাদ প্রচার করলেও কেউই ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবেশীদের থেকে কোনো মন্তব্য না-নেওয়ায় গ্রামবাসী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারেক-টুনির পরকীয়া কাণ্ড নিয়ে নানা গাল-গপ্প বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়াছড়ি কিন্তু কোনো সাংবাদিককে ঘটনাস্থলে এসে প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলতেও দেখলাম না। এর আগে তারেক এক ভাড়াটে সাংবাদিক এনে তার বাড়ির সামনে সুটিং করলো কিন্তু আমাদের কাছে কিছুই জানতে চাইলেন না। প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারতেন, তারেকের জঘন্য কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত।
কলমা-১ এর সন্নিকটে অরুণাপল্লীর পাশেই একটি খালি জায়গায় মাদকসেবী বন্ধু কামাল, নাজমুল, রাজু, শাহীনদের নিয়ে মাদক সেবন ও বেচা-কেনায় ব্যস্ত থাকে তারেক।
তারেকের প্রসঙ্গে তারা আরোও জানায়, একটি ব্যাংকের শাখা ও সমিতি থেকে টুনির নামে লোন নিয়ে নির্মাণাধীন বাড়ী থেকে ভাড়াবাবদ প্রাপ্ত প্রায় ৬৫ হাজার টাকা লোনের কিস্তি পরিশোধ না-করে তারেক মাদকগ্রহণ ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্য খরচ করার দাবী করলে, টুনি তাতে সায় না দেয়ায় তারেক প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে টুনিকে মারধর করে। বাড়ীটি বিক্রি করার জন্য গোপনে সে তার পরকীয়া প্রেমিকার সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কিন্তু তারেক ও টুনির যৌথ মালিকানাধীন হওয়ায় তারেকের এ পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে অকৃতজ্ঞতার শেষমাত্রায় পৌছে, নিজের কিডনি দিয়ে বাঁচিয়ে তোলা স্ত্রীর বিরুদ্ধেই পরকীয়ার কুৎসা রটায়।
চতুর্মুখি চাপে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে টুনি। একেতো সে একটিমাত্র কিডনি নিয়ে বেঁচে আছে উপরন্তু, বাড়ীভাড়া না হওয়ায় অর্থাৎ রুম খালি থাকায়, নিজের নামে গ্রহণ করা সমিতির মাসিক কিস্তি নির্দিষ্ট তারিখে পরিশোধ করতে পারছে না সে। ফলে খুব শীঘ্রই সমিতি কিংবা ব্যাংক টুনির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এমন দুশ্চিন্তায় সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে তাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারেকের পরিকল্পিত মিথ্যাচারের ভিডিও সাক্ষাৎকারে দর্শকদের স্পর্শকাতর মন্তব্যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে একমাত্র ছেলে দিব্যকে আগে খুন করে, নিজে আত্মহননের পথ বেছে নেবার কথাও জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে টুনি বলেন, আমার স্বামীকে আমি সবসময় ফেরেশতার মতো মনে করতাম। ভাবতাম, তিনি কখনোই মিথ্যা বলেন না। তবে, আমার পরিবারের মানুষ ধাপে ধাপে সতর্ক করেছিল। কারো কথা কানে নিইনি। বরং তারেকের কথায়, অনেক সময় পরিবারের মানুষদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেছি। অথচ সেই মানুষটা আজ আমার সব কেড়ে নিল। তাকে কিডনি দেওয়ার পরে আমার শারীরিক অবস্থাও দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। চিকিৎসকেরাও নানাভাবে সতর্ক করেছেন।
বর্তমানে তারেক বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব বিকৃত-কাল্পনিক তথ্য উপস্থাপন করে যাচ্ছে তাতে মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পরেছি। গণমাধ্যম যেভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়াই আমার বিরুদ্ধে বিকৃত বক্তব্য তুলে ধরছে তাতে সমাজে মুখ দেখানো দায়।
তিনি আরও বলেন, আমি জানি, সুস্থভাবে হয়তো বেশিদিন আর বাঁচতে পারব না। তবুও যেই মানুষটার কষ্ট কখনো নিজের চোখে দেখতে পারতাম না, যার জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছি, সেই কিনা আমাকে এভাবে ঠকালো! আমার পেটে অপারেশনের জায়গাতে লাথি মারলো…! আমি চাই না, আমার মতো পরিণতি আর কোনো মেয়ের হোক। আর কোনো মেয়ে যেন ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে নিজের জীবনকে এমন অন্ধকারে না ঠেলে দেয়।’
এ প্রসঙ্গে টুনির মা বলেন, পারিবারিকভাবে আমাদের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল। তারেকের চিকিৎসায় প্রতি বছর গড়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হতো। সেই টাকা টুনি কখনো আমাদের থেকেও নিয়ে যেতো। আমার পেনশনের পুরো অর্থ তারেকের চিকিৎসায় খরচ করেছি। একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করে টুনিদের থাকার জন্য বিল্ডিং তুলে দিয়েছিলাম। সেই বাড়ির অর্ধেক মেয়ের নামে আর বাকি অর্ধেক তারেকের নামে। অথচ আজ সেই বাড়ি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য আমার মেয়েকে নির্যাতন করছে, পরকীয়া প্রেমিকার সঙ্গে থাকছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা তারেকের প্রতারণার কঠিন শাস্তি চাই। যেন আমার মেয়ের মতো কোনো মেয়ের জীবন এভাবে ধ্বংস না হয়।
মামলা প্রসঙ্গে টুনির আইনজীবী নেহার ফারুক বলেন, দিনের পর দিন আমার বাদীকে নির্যাতন করে গেছেন তারেক। একটা মানুষ কতটা অকৃতজ্ঞ হলে, যার দয়ায় আজ তিনি বেঁচে আছেন, তার সঙ্গেই এমন করতে পারেন আমরা এখনো মামলার চার্জশিট হাতে পাইনি। চার্জশিট হাতে পেলেই তারেকের জামিন বাতিলের আবেদন করব। আমার বিশ্বাস, এই ঘটনায় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবেন আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান টুনি-তারেকের এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, যেই নারী তারেককে প্রাণে বাঁচাতে নিজের কিডনি দিয়েছেন, বিয়ের দুই বছর পর স্বামীর এমন অবস্থা আবিষ্কার করেও হাত ছেড়ে যাননি, অথচ সুস্থ হয়ে কিনা তার ওপরই নির্যাতন শুরু করেছেন। এ ধরনের প্রতারকদের কারণে স্বামী-স্ত্রীর সত্যিকারের ভালোবাসার প্রতিও মানুষের অবিশ্বাস তৈরি হয়।
ইশরাত হাসান বলেন, কেবল নারী নির্যাতন নয়, টুনির উচিত মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইনেও তারেকের বিরুদ্ধে মামলা করা। কারণ, প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি স্ত্রীর কিডনি নিয়েছেন, পরে তার ওপর নির্যাতন শুরু করেছেন। এমনকি বিয়ের এত বছরেও স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাননি, সেই ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারেন। এসব ঘটনায় একজন আসামির দ্বারা বাদীর ক্ষতি সাধনেরও শঙ্কা থাকে। সেক্ষেত্রে টুনির উচিত হবে আদালতের কাছ থেকে সুরক্ষা আদেশ নেওয়া। যেন তিনি নিজ বাড়িতে সুরক্ষিত থাকতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি তারেক স্ত্রীর সঙ্গে যে অন্যায় করেছেন, তার এমন শাস্তি হওয়া উচিত যেন ভবিষ্যতে কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণার কথা দুঃস্বপ্নেও না ভাবতে পারেন।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫