শাহান সাহাবুদ্দিন
বিশেষ প্রতিনিধি
২৯ জুলাই ২০২৫। অগ্নিদীপ্ত দিনে মাঠে, কাগজে—কলমে চলছিল লড়াই। গাজীপুরের দাবদাহে পুড়ে দিনভর কাজ করছিলাম বাংলাভূমির বিশেষ সংখ্যার জন্য। সেই লড়াইয়ে ছিলেন এক দুরন্ত যোদ্ধা—প্রিয় সাঈদুর রহমান রিমন ভাই। বাংলাদেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক অনন্য ও দীপ্ত নাম। তাঁর নেতৃত্বেই চলছিল একটি যুগান্তকারী সংখ্যা—বাংলাদেশ বনবিভাগ ও পরিবেশ ধ্বংসের দায় নিয়ে সাহসী প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি। আমি তাঁর সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করছিলাম, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
সেদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যারাত পর্যন্ত দৈনিক বাংলাভূমি অফিসে সম্পাদক ও প্রকাশক জনাব মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে চলছিল গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা। প্রচ্ছদ রিপোর্ট ছিল আমাদের যৌথ নির্মাণ। রাত জেগে কাজ করার শপথ ছিল আমাদের। কারণ—‘যতদিন অন্যায়ের মুখোশ খসে না পড়ে, ততদিন কলম থামবে না’—এই ছিল আমাদের বিশ্বাস।
কিন্তু ৩০ জুলাই ২০২৫ ধলিপাড়া সাহেববাড়ি রিসোর্টে বিশেষ সংখ্যাটির কাজ শেষে দুপুরে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। সঙ্গে ছিলাম আমি, সাংবাদিক তুহিন ভূঁইয়া, জামাল সরকার—বাংলাভূমি টিমের একাংশ। প্রথমে গ্যাস্ট্রিক ভেবে ওষুধ দেওয়া হয়। পরে পার্শ্ববর্তী আরপি গেইট বাজারে নরওয়ে—বাংলাদেশ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ইসিজিতে হৃদরোগের সংকেত পাওয়া যায়। কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত তাঁকে তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেটকার ও সিএনজি অসংখ্যবার চেষ্টা করেও পাওয়া গেল না। পরে হাসপাতালের পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইকবাল সিদ্দিকী স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রিয় মিঠুন সিদ্দিকীকে অনুরোধ করি তাঁর প্রাইভেটকার দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করার। তিনি আসেন এবং নিজেই ড্রাইভ করেন। আমি, তুহিন ভুঁইয়া ও জামাল সরকার রিমন ভাইকে কারে উঠিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। আমাদের ফোন পেয়ে বাংলাভূমি সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার ভাই ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অপেক্ষা করছিলেন। পোড়াবাড়ি ভাওরাইদ স্কুলের সামনে প্রাইভেট কার বিকল হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক উল্টো দিক থেকে আসা একটি পিক—আপে রওনা হই। আমাদের হাতে সময় ছিল না। কারণ রিমন ভাইয়ের অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছিল। তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেলে পৌঁছি। ডাক্তার রিমন ভাইকে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার ভাইকে কিছু একটা বলেন। পরে বুঝতে পারি ততক্ষণে… সব শেষ। দুপুর আনুমানিক আড়াইটায় চিকিৎসকরা জানান—তিনি আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মৃত্যুর আগেও বলছিলেন ‘ইয়া হাফিজু, ইয়া হাফিজু’, সঙ্গে অনবরত আমাদের পাশাপাশি পড়ে যাচ্ছিলেন দোআ,এবং স্মরণ করছিলেন মহান আল্লাহকে। তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন একনিষ্ঠ হয়ে। আগের দিনও সৃষ্টিশীলতায় ছিলেন নিমগ্ন। ২৯ জুলাই বিকেল ও সন্ধারাতেও বাংলাভূমি জয়দেবপুর অফিসে সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে আমাদের সঙ্গে নীতি নির্ধারণী মিটিং করেছিলেন। প্রতিটি পাতায় ছিল তাঁর চিন্তার ছাপ। মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও ছিলেন কর্মে, দোয়ায়, সাহসে।
সাঈদুর রহমান রিমন ভাই ছিলেন প্রতিভা, সততা, মানবিকতা ও নিষ্ঠার প্রতীক। বাংলাদেশ প্রতিদিন, বিডিনিউজ২৪, দেশবাংলা, ইত্তেফাক, বাংলাবাজার, দৈনিক সংবাদসহ বহু প্রতিষ্ঠানে তিনি রেখেছেন দীপ্ত পদচিহ্ন। তাঁর হাতে বাংলাভূমি এগিয়ে যাচ্ছিল জাতীয় দৈনিক হিসেবে। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েই আমি ‘ভোরের কাগজ’ ছেড়ে বাংলাভূমিতে যোগ দিই। তাঁর স্বপ্নে, তাঁর নেতৃত্বে ছিল আমাদের স্বপ্ন। আজ মনে হচ্ছে আমরা যেন কণ্ঠহীন হয়ে গেছি।
তিনি ছিলেন এক দিগন্তজোড়া কলম। তাঁর চোখে ছিল অন্যায় ভেদ করার দীপ্তি, হৃদয়ে ছিল অসহায়ের কান্নার দায়বদ্ধতা। আমরা যারা তাঁর সহযোদ্ধা, কলমসাথী—আজ ভেঙে পড়েছি। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আমরা ভাঙতে দেব না। তাঁর অসমাপ্ত শিরোনাম, অর্ধলিখিত প্রতিবেদন, বুকের মধ্যকার আগুন আমরা জ্বালিয়ে রাখবো।
আপনাকে জানাই অশ্রুভেজা বিদায়, রিমন ভাই।
প্রার্থনা করি—আপনার সত্যপ্রেম, ভালোবাসা, সততার প্রতি দায়বোধের প্রতিদানস্বরূপ মহান আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন।
আমীন।
আপনি বলেছিলেন—‘কলম থেমে গেলে অন্যায় জিতে যায়।’
আমরা কলম থামাবো না ভাই। আপনার জন্য, দেশের জন্য, সত্যের জন্য লিখে যাবো।
আপনি থাকবেন বাংলাভূমির প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি হৃদয়ে।
রিমন ভাই: অনুসন্ধানের জীবন্ত প্রতিমা
সাঈদুর রহমান রিমন ছিলেন একজন কিংবদন্তি অনুসন্ধানী সাংবাদিক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৮০০০টি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রায় ৪০০টি প্রতিবেদন লিড হিসেবে প্রকাশিত হয়। মাস দুয়েক আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘চিত্রশিল্পীরাও তো প্রদর্শনী করেন। রিপোর্ট নিয়ে প্রদর্শনী হয় না। আমি চাই আমার রিপোর্টগুলোর প্রদর্শনী হোক—দেশ জানুক। সাংবাদিক সহযোদ্ধার উৎসাহিত হোক, মানুষের জাগরণ ঘটুক। আপনি আমার পাশে থাকবেন প্রিয় ভাই।’ এমন ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি ছিলেন দেশবাংলার সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানী সেলের ইনচার্জ, বিডিনিউজ, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, বাংলাবাজার, দৈনিক সংবাদসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী এক সাহসী কণ্ঠ। সর্বশেষ দায়িত্ব নিয়েছিলেন দৈনিক বাংলাভূমির প্রধান সম্পাদক হিসেবে। বাংলাভূমি নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল।
‘সুন্দরবনের কান্না’, ‘মানুষ উধাও’, ‘আয়নাঘর’, ‘ইলিয়াস নিখোঁজ রহস্য’, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইয়াবা সিন্ডিকেট’, ‘শেরপুর সীমান্তে সন্ত্রাসে ৭০০০ গ্রামবাসীর পলায়ন’, ‘কিশোর গ্যাংয়ের সর্বনাশ’, ‘শাল—গজারী নিঃশেষ’, ‘আদিবাসীদের মামলা আতঙ্ক’—প্রতিটি প্রতিবেদন যেন বিস্ফোরণ। তিনি ছিলেন কলমের সৈনিক।
জীবন ও জীবনচিন্তা
সাদামাঠা জীবন যাপন করতেন। প্রকৃতি ও মানুষকে ভালোবাসতেন। শালবন, পাহাড়, সমুদ্র, নদী—সব তাঁকে ডেকেছে। আধ্যাত্মিক ভাবনাও গভীর ছিল। বৃহস্পতিবার নফল তাহাজ্জুদসহ বিশেষ ইবাদত করতেন। ছিলেন মানিকগঞ্জের ঘিওরের জাবড়া গ্রামের বিখ্যাত পীরবাড়ির সন্তান। দাদা এখলাস উদ্দিন কুতুব মন্ডল ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক। সেই প্রভাব পড়েছিল রিমন ভাইয়ের চিন্তায়, মানসজগতে।
কখনো আদর্শচ্যুত হননি। অনৈতিক অর্থে আগ্রহ ছিল না। স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের মতো। শত শত সাংবাদিক গড়েছেন তিনি। অনেক প্রতারণা, আঘাত পেয়েও মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন।
জীবনের শেষ রাতেও বলেছিলেন—‘আপনার আপার জন্য, মামণির জন্য কিছুই করতে পারিনি ভাই… বিবেক দংশন করে।’ আমাদের প্রিয় চামেলি আপা ও মামণিকে খুব ভালোবাসতেন। আমার স্ত্রী মৌসুমিকে বোন বলতেন। আমার পুত্র আবরার গল্পকে ভাগ্নে ডেকে দোআ করতেন। বলতেন, ‘ভাগ্নে একদিন বড় মাপের মানুষ হবে। পরিচর্যার যেন ঘাটতি না হয়।’
উৎসর্গপত্র
সাঈদুর রহমান রিমন ভাইয়ের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে, সম্পাদক ও প্রকাশক প্রিয় মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার ভাইয়ের পরামর্শে দৈনিক বাংলাভূমির বনবিভাগ—সংক্রান্ত বিশেষ সংখ্যাটি তাঁকেই উৎসর্গ করছে বাংলাভূমি পরিবার।
মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি সম্পাদনা করেছিলেন এই সংখ্যাটি। ইয়া হাফিজু ও অন্যান্য দোআ পাঠ করতে করতে, সৃষ্টির দায় নিয়ে, সততার দীপ্তি নিয়ে তিনি চিরনিদ্রায় চলে যান মহান আল্লাহর কাছে। এই সংখ্যা তাঁর কীর্তির, দায়বোধের, এবং অনন্ত জীবনের চিহ্ন হিসেবে রইবে।
হে মহান আল্লাহ,
তুমি তোমার ‘হাফিজ’ নামের গুণে
তাঁকে কবুল করো
জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে।
আমীন।
