চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
অর্ধশত শিক্ষার্থীর মাথায় অস্ত্রের কোপ, অনেকের থেঁতলে গেছে হাত-পা, স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এলাকায় শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহতের সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক ছাড়া বাকিরা প্রায় সবাই শিক্ষার্থী। আহত শিক্ষার্থীদের অনেকে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তাদের বেশ কয়েকজন এখন ভর্তি আছেন আইসিইউতে। অনেকের হাত-পা ভেঙে ও থেঁতলে গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থীর মাথায় ধারালো অস্ত্রের কোপের আঘাত রয়েছে। পাঁচ শিক্ষার্থীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের মাথায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। আনুমানিক শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে অর্ধশত শিক্ষার্থীর শরীরে ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই মাথায় ও হাতে আঘাতপ্রাপ্ত। পাঁছ-ছয়জন আছেন বেসরকারি হাসপাতালের আইসিউতে। আহতদের মধ্যে এক শিক্ষার্থীর মাথার মগজ কেটে যাওয়ায় তাকে ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। ১০ শিক্ষার্থীর হাত-পা ভেঙে ও থেঁতলে গেছে। কয়েকশ শিক্ষার্থীকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। হামলায় আহত হয়েছেন শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। শিক্ষার্থীদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। তারা হেলমেট পরে ছাত্রদের ধরে ধরে কুপিয়েছে। আমরা রাত থেকে প্রশাসনের সঙ্গে অনেক যোগাযোগ করেও তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমাদের শত শত শিক্ষার্থী হাসপাতালে কাতরাচ্ছে।- অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন
চমেক হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. বুশরা জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, রোববার সকাল থেকে আনুমানিক শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে অর্ধশত শিক্ষার্থীর মাথায় ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই মাথায় ও হাতে আঘাতপ্রাপ্ত। পাঁছ-ছয়জন আছেন বেসরকারি হাসপাতালের আইসিউতে।
সংঘর্ষে রণক্ষেত্র চবি, প্রোভিসি-প্রক্টরসহ আহত ৭০, পুরুষশূন্য জোবরা গ্রাম, ক্যাম্পাসজুড়ে উৎকণ্ঠা
উপাচার্যের বক্তব্যের প্রতিবাদে নারী শিক্ষার্থীদের অবস্থান
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। আমাদের প্রক্টর ও প্রোভিসি (একাডেমিক) আহত। তারা হেলমেট পরে ছাত্রদের ধরে ধরে কুপিয়েছে। আমরা রাত থেকে প্রশাসনের সঙ্গে অনেক যোগাযোগ করেও তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমাদের শত শত শিক্ষার্থী হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল লোহার রড, পাইপ, কাঠের গুঁড়ি ও পাথর। গ্রামবাসীর হাতে ছিল রামদা, লোহার রড ও পাইপ। সংঘর্ষে জোবরা গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে গ্রামের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। এসময় অনেক শিক্ষার্থী অলিগলিতে আটকে গেলে তাদের বেধড়ক মারধর করা হয় তিনি বলেন, যুবলীগ নেতা হানিফের অনুসারী সন্ত্রাসীরা সরাসরি ধারালো অস্ত্র হাতে এ হামলা চালিয়েছে। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। গুরুতর আহতদের বিশেষ চিকিৎসা নিশ্চিতে খোঁজখবর রাখছে প্রশাসন।
পরিকল্পিতভাবে এ হামলায় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। শত শত লোকের হাতে ধারালো অস্ত্র তাৎক্ষণিক আসার কথা নয়। শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে কুপিয়েছে এলাকার সন্ত্রাসীরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ এ হামলা চালিয়েছে।- দাবি শিক্ষার্থীদের তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয়রা পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। মাইকে ঘোষণা দিয়ে তারা দা-ছুরি নিয়ে হামলে পড়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নজির আছে। হামলায় অংশ নেওয়া জড়িতদের বিচারের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান তারা। গত শনিবার (৩০ আগস্ট) দিনগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে গতকাল রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় ক্যাম্পাস সংলগ্ন জোবরা গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ চলে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত দুই শতাধিক লোক আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজন ছাড়া বাকি প্রায় সবাই শিক্ষার্থী। আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপ-উপাচার্য, প্রক্টর ও দুই সহকারী প্রক্টর রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার রাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্রী সুফিয়া খাতুন ক্যাম্পাসের ২ নম্বর গেটের কাছে একটি ভাড়া ভবনে থাকেন। ওইদিন রাতে ওই ভবনে প্রবেশের সময় দেরিতে আসার অজুহাতে তাকে ঢুকতে দেননি দারোয়ান। রাত ১২টা পর্যন্ত তাকে গেটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। ওই ছাত্রী প্রতিবাদ জানালে গেট খুলে তাকে মারধর করেন দারোয়ান। পরে ফোন করে সহপাঠীদের বিষয়টি জানান ভুক্তভোগী ছাত্রী। খবর পেয়ে ভুক্তভোগীর সহপাঠী ও অন্য শিক্ষার্থীরা ওই দারোয়ানকে ধরতে গেলে তিনি পালিয়ে যান। শিক্ষার্থীরা তাকে ধাওয়া করলে স্থানীয়রা ইটপাটকেল মারা শুরু করেন। তখনই সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। ওই ছাত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো আমি আজও সময়মতো বাসায় চলে আসি। ১২টার আগেই আমি বাসার সামনে পৌঁছাই। দারোয়ানকে দরজা খুলতে বললে তিনি খুলছিলেন না। পরে জোরে ডাক দিলে তিনি অকথ্য ভাষায় কথা বলেন। আমি জবাব দিতে গেলে হঠাৎ চড় মারেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার রুমমেটরা নামলে তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং লাথি মারতে থাকেন।’ অর্ধশত শিক্ষার্থীর মাথায় অস্ত্রের কোপ, অনেকের থেতলে গেছে হাত-পা
এরপর রাত প্রায় সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে দুপক্ষ সরে যায়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ওই রাতেই অন্তত ৭০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। রাতের ঘটনার পর ২ নম্বর গেট থেকে জোবরা হয়ে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি
চবিতে আহত শতাধিক শিক্ষার্থী চমেক হাসপাতালে, এসময় শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল লোহার রড, পাইপ, কাঠের গুঁড়ি ও পাথর। গ্রামবাসীর হাতে ছিল রামদা, লোহার রড ও পাইপ। সংঘর্ষে জোবরা গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে গ্রামের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। এসময় অনেক শিক্ষার্থী অলিগলিতে আটকে গেলে তাদের বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় অনেক শিক্ষার্থীকে নেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে। রোববার দুপুর ১২টার দিকে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠে ক্যাম্পাস এলাকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন। বিকেল সাড়ে ৩টার কিছু আগে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা জোবরা গ্রামে প্রবেশ করেন। এসময় শিক্ষার্থীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীল গাড়ি ঘিরে ক্ষোভ জানান। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উভয়পক্ষকে সরিয়ে দেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হামলার ঘটনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ছাত্রলীগ ও যুবলীগের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলছে।
সংঘর্ষের কারণে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে এ হামলায় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। শত শত লোকের হাতে ধারালো অস্ত্র তাৎক্ষণিক আসার কথা নয়। শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে কুপিয়েছে এলাকার সন্ত্রাসীরা।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ এ হামলা চালিয়েছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন, স্থানীয় ক্যাডাররা এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা নিরীহ শিক্ষার্থীদের মেস থেকে বের করে পিটিয়েছে।
এক শিক্ষার্থীকে কুপিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন নির্মমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আর ঘটেনি—বলছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, এক শিক্ষার্থীকে ছাদে তুলে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। কয়েকজন মিলে তাকে ছাদের কিনারায় নিয়ে যান। এরপর একজন তাকে পেছন থেকে লাথি মেরে ছাদ থেকে ফেলে দেন।
চবির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার চরম ব্যর্থ
স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীদের অনেকেই এলাকা ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।
অর্ধশত শিক্ষার্থীর মাথায় অস্ত্রের কোপ, অনেকের থেঁতলে গেছে হাত-পা
আপডেট :September 1, 2025
0
সম্পর্কিত আরও সংবাদ
সাম্প্রতিক সংবাদ
আর্কাইব
প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার
ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।
সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫
