সরকার জামাল
বিশেষ প্রতিবেদক:
গত এক সেপ্টেম্বর রাতে বান্ধবীকে নিয়ে রাজধানীর আদাবরে সুনিবির হাউজিং এ ঘুরতে যায় পলাশ নামে এক যুবক। এ সময় তাদের জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে কিশোর গাং সদস্যরা। পরে পলাশের পরিবার ঘটনা শুনে সাহায্য চায় পুলিশের কাছে, ঘটনাস্থলে যায় আদাবর থানা পুলিশ, এ সময় কিশোরগাং লিডার জনি, রনির মা রেজ্জেকা বেগম পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দেয় পরে উপযুপুরি কোপানো হয় পুলিশ সদস্য সহ তিনজনকে। ভাংগা হয় পুলিশের গাড়িও। এই কিশোর গাং গ্রুপে নেতৃত্ব দেয় রনি ও জনি নামের আপন দুই ভাই। এরা দুইজনই কব্জি কাটা আনোয়ারের খুবই ঘনিষ্ঠ। পুলিশের দাবি এদের মদদ দাতা স্থানীয় বিএনপি নেতা মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হলে। সেই সুযোগে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান। যার ফলে গত বছর ০২ সেপ্টেম্বর দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকান্ডের জড়িত থাকার অভিযোগে এনে বিএনপি থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গার তদবির লবিং করে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করায়। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর সে আগের তুলনায় আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
মোহাম্মদপুরে আদাবরে যে সব আলোচিত যেসব সন্ত্রাসী আছে বর্তমানে যেমন কব্জি কাটা আনোয়ার গ্রুপ, এক্সেল বাবু গ্রুপ, পাপ্পু গ্রুপ, কিলার বাদল গ্রুপ, কিলার লাল্লু গ্রুপ, জনি রনি কিশোর, গ্যাং, গাংচিল বাহিনীর লম্বু মোশারফ গ্রুপ, একাধিক কিশোর গাং গ্রুপের বড় ভাই হয়ে ওঠে মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান। এসব গ্রুপের অধিকাংশ নেতৃত্ব পর্যায়ের সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছে। তাদের অনুপস্থিতে এইসব গ্রুপের সম্পন্ন নিয়ন্ত্রণ লেদু হাসানের হাতে। তার নির্দেশেই চলে এইসব গ্রুপের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
সম্প্রতি কয়েক মাস আগে রাজধানীর আদাবর থানায় ঢুকে এক মামলার বাদী নারীকে হেনস্তা ও হুমকি দেয় বিএনপির নেতা লেদু হাসান। তিনি ওই নারীকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘একদম চুপ, একদম চুপ; না হলে কিন্তু একদম ঢোকায় দিমু, জিন্দিগি বরবাদ করে দিমু, ধ্বংস হয়ে যাবি।’
এছাড়াও অভিযোগ আছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন সময় ফোন করে চাঁদা দাবি করেন লেদু হাসান। বলেন, আমি আদাবর থানা বিএনপির মা—বাপ, আমি যা বলব তাই হবে। যত টাকা চাইব, তত টাকাই আমাকে দিতে হবে। থানা—পুলিশে অভিযোগ দিলে টাকার পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। পুলিশ আমার কথায় ওঠে আর বসে। আমার কথা না শুনলে পরিনাম হবে ভয়ংকর।
টেলিফোন এমন সংলাপ শোনা যায়, আদাবর থানা বিএনপির আহ্বায়ক পরিচয় দেওয়া লেদু হাসানের। এর বাইরে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজও রয়েছে। পুলিশের খাতায় লেদু হাসান একজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ।
বৃহত্তর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার একাধিক ব্যবসায়ীর কাছে ঈদ সালামির নামে লেদু হাসানের মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির করেন।
লেদু হাসানের শুধুই চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়!
তার রয়েছে মাদকের বিশাল এক সিন্ডিকেট। মোহাম্মদপুর আদাবর মাদক ব্যবসা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে এই লেদু হাসান। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, আদাবর, শনিরবিল, শেখেরটেক, জেনেভা ক্যাম্প, জহুরী মহল্লা, বিহারী কটার সকল স্তরে, একক মাদক ব্যবসা এই লেদু হাসানের নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ আছে এলাকায় তার ইয়াবা ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় ২০১৭ সালে মশিউর রহমান মশু নামে এক ছাএ নেতাকে হত্যা করে। মশিউর হত্যার ঘটনায় মশুর বাবা জুলহাস মিয়া লেদু হাসান, মোল্লা স্বপন, সেলিম, সাগরসহ আটজনকে আসামি করে মামলা করে।
কে এই লেদু হাসান!
লক্ষ্মীপুর জেলার ভবানীগঞ্জ চৌরাস্তা খুবই দরিদ্র পরিবার এক অজপাড়া গাঁয়ে তার জন্ম। বাবা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। জীবনের তাগিদে বাবার সাথে ১৯৯০ সালে সপরিবারসহ ঢাকায় আসেন।
দুই ভাই চার বোন সহ মোহাম্মদপুর জহুরী মহল্লা এক বস্তিতে বসবাস শুরু করে, লেদুর বাবা হারিজ বেপারী ও বড় ভাই রিকশা চালিয়ে জীবন জীবিকা শুরু করে। বড় বোনকে বিয়ে দেয় এক রিকশা চালকের সাথে, আর এক বোনের বিয়ে হয় রাজমিস্ত্রির সাথে, অন্য একজনকে বিয়ে দেয় গাড়ি চালকের সাথে। লেদুর বাবা মারা যাওয়ার পর। হঠাৎ করে লেদুর বড় ভাইও অসুস্থ হয়ে মারা যায়। সংসারের হাল ধরার জন্য লেদুর মা ও বোনেরা ফুটপাতে টং দোকান বসিয়ে চা পান বিক্রি শুরু করে। সেই চা পান বিক্রির ব্যবসায় এখনো চলমান।
লেদু হাসানের উত্থান!
পঞ্চম শ্রেণির পড়–য়া লেদু হাসান ধূর্ত চালাক, ছোট বিভিন্ন সার্কেলের সাথে চলাফেরা শুরু করে, এক পর্যায়ে রাজনৈতিক সার্কেলের সাথে মিশে যায়, ছাত্রলীগ পরবর্তীতে যুবলীগ নেতাদের ছত্রছায়া ক্যাডার হয়ে অপকর্ম শুরু করে, এমন কি নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি, জমি দখল, টেন্ডারবাজি, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা মানুষ কে কুপিয়ে হত্যা এবং মাদক ব্যবসায় পারদর্শী হয়ে উঠে।
ধীরে ধীরে এলাকায় এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে লেদু হাসান।
২০০১ এর পর কন্টাক কিলার হয়ে বিভিন্ন হত্যায় জড়িয়ে পড়ে। একটি আলোচিত ঘটনা ঢাকা মহানগর উত্তরের ছাত্রনেতা কে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করে, পরবর্তীতে গ্রেফতার হয়।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোন পোস্ট পজিশন পাইনি বলে, জেলে বসেই যুবদলে যোগদান করে।
২০১০ সালে বহুল আলোচিত ওহিউদুজ্জামান হত্যা মামলায় এজাহার নামীয় আসামি হিসেবে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লেদু হাসান আরও বেপরোয়া হয়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হন। এর বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর, আদাবর থানাসহ বিভিন্ন থানাতে হত্যা চাঁদাবাজি সহ প্রায় ২ ডজন মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
