মোঃ জিয়াউর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার:
নগর সংস্কার ও আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সময়ে সময়ে বস্তি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। শহরের পরিকল্পিত উন্নয়ন, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি উদ্ধার, নদী—খাল রক্ষা কিংবা সড়ক সম্প্রসারণের মতো কারণে এসব অভিযান পরিচালিত হলেও, উচ্ছেদের পর নিম্নআয়ের মানুষের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বিশেষ করে পূর্বঘোষণা ও টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া আকস্মিক উচ্ছেদ তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে গভীরভাবে ব্যাহত করে।
উচ্ছেদের পর অনিশ্চিত জীবন
রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে খালি জমি উদ্ধার, নদী—খাল রক্ষা, সড়ক সম্প্রসারণ ও নগর সৌন্দর্যবর্ধনের বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে বস্তি উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উচ্ছেদের আগে বস্তিবাসীদের জন্য বিকল্প বাসস্থানের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকে না। ফলে অভিযানের পর নারী, শিশু ও বয়স্কসহ শত শত পরিবার মাথা গেঁাজার ঠাঁই হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
শিক্ষা ও শিশুদের ওপর প্রভাব
আকস্মিক উচ্ছেদের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়। বই—খাতা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ হারানোর পাশাপাশি নতুন এলাকায় স্থানান্তরের কারণে অনেক শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বাড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা
বস্তিবাসীদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মী, রিকশাচালক, দিনমজুর, হকারসহ শহরের বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। কর্মস্থলের কাছাকাছি বসবাসের সুযোগ হারালে তাদের অনেকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে বাসস্থান হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আয় কমে গিয়ে পরিবারগুলো আরও বেশি দারিদ্রে্যর মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
উচ্ছেদের পর অস্থায়ী বা খোলা জায়গায় বসবাস করতে গিয়ে নারী ও শিশুরা নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি সুপেয় পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
প্রয়োজন পরিকল্পিত পুনর্বাসন
নগর উন্নয়ন ও জনস্বার্থে কোনো এলাকায় উচ্ছেদ প্রয়োজন হলে তার সঙ্গে পুনর্বাসন পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সময় দিয়ে নোটিশ প্রদান এবং পুনর্বাসনের স্থানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বস্তিবাসীদের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসন প্রকল্প, দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং সরকারি—বেসরকারি অংশীদারত্বে আবাসন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
উন্নয়ন হোক মানবিক
একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে নিম্নআয়ের মানুষের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। নগর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি উন্নয়নের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষকে হঠাৎ করে গৃহহীন করে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
পরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে মানবিকতা ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। নগরকে সুন্দর ও আধুনিক করার পাশাপাশি সেখানে বসবাসকারী নিম্নআয়ের মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।
