ডেস্ক রিপোর্ট:
পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও পাঞ্জাবের কয়েকটি শহরে মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ভারত। হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত ও ৪৬ জন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
২০২৫ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুদেশের উত্তেজনা পরামাণু যুদ্ধের দিকে কি এগিয়ে যাবে? অবশ্য এমন একটি ভবিষদ্বাণী ২০১৯ সালেই একটি গবেষণায় উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সেই গবেষণায় বলা হয়েছে, কাশ্মীর বিরোধের জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক যুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।
বিবিসির রিপোর্টে এই যুদ্ধ লাগার পেছনে কয়েকটি দৃশ্যের কথা বলা হয়েছে। যার একটি চলমান কাশ্মীর সহিংসতা। গবেষণায় বলা হয়, কাশ্মীরে আক্রমণ করবে ভারত। তার পর শুরু হয়ে যাবে পারমাণবিক যুদ্ধ। তবে উভয় দেশে যদি বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন নেতারা ক্ষমতায় থাকেন তাহলে হয়তো এরকম কিছু হবে না। তবে ভিন্ন কিছু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অ্যালান রোবোক, যিনি এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন, বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে। শুধু সংখ্যার বিচারেই নয়, এসব অস্ত্রের বিস্ফোরণের শক্তিও তারা ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে। ফলে তাদের আশঙ্কা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেই এই যুদ্ধের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।’
কেন ২০২৫?
গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালেই যুদ্ধে জড়াতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার চির-বৈরি দুটো দেশ: ভারত ও পাকিস্তান। যুদ্ধের এই সময় কীভাবে নির্ধারণ করা হলো? অধ্যাপক রোবোক বলছেন, ভবিষ্যৎ থেকে তারা শুধু একটি বছরকে বেছে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ যেকোনো সময়ে লাগতে পারে, হতে পারে আগামীকালও। ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো তথ্য থাকে না। কখন কী হবে সেটাও কেউ বলতে পারে না। সেকারণে আমরা কিছু দৃশ্য-কল্প ব্যবহার করেছি কী হতে পারে সেটা বোঝার জন্যে। সেই সম্ভাবনার কথা চিত্রিত করতে আমরা শুধু একটা সময়কে বেছে নিয়েছি।’
আমেরিকার রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলছেন, এর ফলে জলবায়ুর ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তাতে অনাহারে মারা যাবে আরো বহু কোটি মানুষ। এরকম এক বিপর্যয়ের ধারণা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর এই দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। এক গবেষণায় এসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারতীয় হামলায় পাকিস্তানে ২৬ জন নিহত
ভারতের বিমান হামলায় পাকিস্তানে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ৪৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। বুধবার (৭ মে) এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেন পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী।
তিনি জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পাকিস্তানের ছয়টি স্থানে ২৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে ভারত। সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বাহাওয়ালপুরের আহমেদপুর ইস্ট এলাকায়। সেখানে নিহত হয়েছেন ১৩ জন, যাদের মধ্যে দুইজন তিন বছর বয়সী শিশু, সাতজন নারী ও চারজন পুরুষ। আহত হয়েছেন আরও ৩৭ জন, এর মধ্যে নয়জন নারী ও ২৮ জন পুরুষ।
মুজাফফরাবাদের কাছে বিলাল মসজিদে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই শিশু—একজন মেয়ে ও একজন ছেলে। কোতলিতে আব্বাস মসজিদে আরেকটি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই কিশোর-কিশোরী—১৬ বছর বয়সী এক মেয়ে ও ১৮ বছর বয়সী এক ছেলে। একই হামলায় আহত হয়েছেন এক নারী ও তার মেয়ে।
তবে শিয়ালকোট ও শাকরগড়ে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন আইএসপিআরের মহাপরিচালক। শাকরগড়ে একটি ডিসপেনসারিতে আংশিক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানান তিনি।
এছাড়া সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের গুলিতে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন ছিল মাত্র পাঁচ বছর বয়সী শিশু।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র অভিযোগ করেন, ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে মসজিদ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকারের চরমপন্থী মানসিকতার প্রতিফলন, যারা পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।’
পাকিস্তানি পাল্টা হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫
পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় ভারতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৫ জন হয়েছে। তাছাড়া আহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৩ জনে পৌঁছেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর বরাতে বুধবার (৭ মে) বিবিসির লাইভে এসব তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে বিবিসি জানিয়েছিল, পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় ভারতে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩২ জন। দিল্লির বিমান হামলার জবাবে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর পাকিস্তান যখন ভারী গোলাবর্ষণ শুরু করে তখন এই ঘটনা ঘটে।
ভারতের সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুঞ্চ ও তাংধরের বেসামরিক এলাকায় গোলাবর্ষণ করেছে পাকিস্তান।
গত ২২ এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পহেলগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জনের প্রাণহানি হয়। এর পর থেকে পারমাণবিক ক্ষমতাধর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। প্রতিদিনই দুই পক্ষের মধ্যে সীমান্তে গোলাগুলি হচ্ছে। চলমান এই উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার (৬ মে) দিনগত রাতে পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত।
হামলার পর নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের পক্ষে দুই ধরনের দাবি উঠেছে। ভারত বলছে, ৭০ সন্ত্রাসীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের ভাষ্য, হামলায় অন্তত ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
