নলডাঙ্গা (নাটোর) প্রতিনিধিঃ
মানুষের রোগ ব্যাধি ও সমস্যার যেন শেষ নেই। সমস্যার সমাধান ও রোগ থেকে মুক্তির আশায় অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেশ—বিদেশে যেতে হয় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার আশায়। সেই সমস্যা আর রোগ ব্যাধি যদি এক পানি পড়া খেয়ে বা তৈল মালিশে ভালো হয় তা হলেতো আর কোন কথা নেই।
ঠিক তেমনি এক বিশ্বাস নিয়ে মানুষের ঢল মসজিদের ইমাম সাহেবের পানি পড়া খেলে নাকি রোগ থেকে মুক্তি মিলছে। এমন বিশ্বাস নিয়েই সেই ইমাম সাহেবের নিকট হাজার হাজার মানুষের ঢল লক্ষ্য করা গেছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখে যায়, মানুষের ভিড়ের কারণে অনেক চেষ্টা করার পরেও সেই ইমাম সাহেবের নিকট পৌঁছাতে পারছেনা অনেকে। শুক্রবার হলেই মানুষের ঢল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ওই মসজিদ কমিটির লোকজন। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার চেঁউখালি গ্রামে বিশ্বাসের পানি খাওয়ার ধুম পড়েছে। হাজারো মানুষের ভীড়ে সেখানে পা রাখাও স্থান নেই। যতদিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। আর এই পানি ও তেল পড়া দেওয়া হচ্ছে, কয়েক মাস থেকে।
প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার জুমআর নামাজের পরেই শুরু হয় পানি ও তেল পড়া দেওয়ার ধুম।
শুক্রবারে মুসলমান, হিন্দু সম্প্রদায়সহ হাজারো নারী—পুরুষ ছুটে আসেন ঐ এলাকার একটি নির্দিষ্ট জায়গায়, শুধু একটি কাজের জন্য,এক গ্লাস ‘বিশ্বাসের পানি’ ও তেল নিতে।
পানি পড়া নিতে আসা দূর—দূরান্ত লোকজনের মুখে নানা রকম কথা কেউ বলছে, আমি লোক মুখে শুনে এসেছি, আবার কেউ বলছে, আমার অনেক সমস্যা ছিল এখান থেকে পানি পড়া নিয়ে আমি এখন সুস্থতা বোধ করছি। এই পানি নাকি রোগমুক্তি ও মানসিক প্রশান্তি দেয়। আর তাই নলডাঙ্গা, রাজশাহীর বাগমারা ছাড়াও দূর—দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে এই পানি খাওয়ার আশায়।
আর এই পানি ও তেল পড়া দিচ্ছেন, নলডাঙ্গার চেঁউখালি বায়তুল নুর জামে মসজিদের পেশ ইমাম জাহিদুল ইসলাম (৩০)। তিনি পাশের আবদানপুর গ্রামের মোঃ আলাউদ্দিন হোসেনের পুত্র।
তিনি প্রতি শুক্রবার মসজিদের পাশে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিজ হাতে পানি ও তেল পড়া বিতরণ করেন। অনেকে সেই পানি বোতলে ভরে বাড়িতেও নিয়ে যাচ্ছেন। পানি পড়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চলছে, সমালোচনার ঝড়।
বিশ্বাসে বস্তু মিলে, এই প্রবাদটি যেন বাস্তবে মিলছে এখানে। এই বিশ্বাস ঘিরেই চেঁউখালিতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট দোকান, পান—চায়ের দোকান, বিক্রি হচ্ছে তেল ও পানির জন্য কাঁচের গ্লাস। তাও বিক্রি করছে অতিরিক্ত দামে, এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী, মছিরউদ্দিন, জহুরুল ইসলামসহ অনেকে বলেন, আমরাও অনেক অসুস্থ ছিলাম, ইমাম সাহেবের পানি পড়া খেয়ে অনেক অনেক সুস্থ। দূর—দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসে পানি পরা নিতে। অনেকে সুস্থ হয়েছে। মানুষ ভালো কিছু পাওয়ার আশায় আসছে, এতে করে এলাকার অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে, মসজিদ কেন্দ্রিক সামাজিক সম্প্রীতিও দৃঢ় হচ্ছে।
বায়তুল নুর জামে মসজিদের পেশ ইমাম জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি কাউকে দাওয়াত দেয়নি, যার ইচ্ছা আসবে, না ইচ্ছে হলে আসবেনা। যা নামাজ পড়বে ও কোরআন বিশ্বাস করবে,তারা পানি খাবে। এখানে কোন টাকা নেওয়া হয়না। বিশ্বাসে বিষ পানি। আমি আগে থেকে পানি পড়া দেই। ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি, নামাজ পড়েন ও পানি খান।
নলডাঙ্গা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি লোকমুখে শুনে সরাসরি তার সাথে দেখা করি সেই ইমাম সাহেব সাথে। আমি তাকে পানি পড়ার বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে, তিনি আমার সঠিক জবাব দিতে পারেনি। আমাকেও পানি পড়া দিয়েছে, কিন্তু আমার কোন উপকারই হয়নি।
নলডাঙ্গা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব, ড. মোঃ ফজলুর রহমান বলেন, এর আগেও এসব ঝিনাইদহ, রানীনগর হইছে। এটা কুসংস্কার, এটা বিশ্বাস করা ইমানের পরিপন্থী, ইসলামের দৃষ্টিতে এটা চলে না। সাধারণ লোকজন বুঝেনা, লোকজন প্রতারিত হচ্ছে। আমরা বলবো এটা ঠিক না।
নাটোরের সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মাদ মুক্তাদির আরেফীন বলেন, ঐ এলাকায় অফিসের লোক পাঠাবো, খোঁজ—খবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
তবে এই পানি খাওয়াকে ঘিরে যাতে কোন কুসংস্কার না ছড়ায়, সেদিকেও খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সমাজসেবীরা।
