বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খানের কয়েক কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন গতকাল অগ্রগতি প্রতিবেদন দুদক সচিব মো. ফায়জুর রহমান চৌধুরীর কাছে জমা দেন। মান্নান খানের অবৈধ সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে বলে এতে উল্লেখ রয়েছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামার তথ্য ধরে সরকারদলীয় সাত ভিআইপির সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তাদের মধ্যে মান্নান খানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আগে দাখিল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দুদক সূত্রমতে, বিগত মহাজোট সরকারের পাঁচ বছর গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে মান্নান খান অর্থ হাতিয়েছেন দুই হাতে। গ্রামের বাড়ির টিনের চালাঘর পরিণত হয়েছে অট্টালিকায়। রাজধানীতে নামে-বেনামে কিনেছেন পাঁচটি ফ্ল্যাট। গ্রামের বাড়ি ও ঢাকায় কিনেছেন প্লট-জমি। স্ত্রী, ভাই, শ্বশুরসহ আত্দীয়স্বজনের নামে করেছেন অর্থ-সম্পদ। সঞ্চয়পত্র, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, এফডিআরসহ বিভিন্ন আকারে মান্নান খান দম্পতির মালিকানায় রয়েছে এসব অর্থ। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েও দালিলিক প্রমাণের অভাবে মান্নান খানকে ‘মালিক’ দেখাতে পারছে না কমিশন। অবশ্য, তিনি যে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছেন তার সঙ্গে প্রকৃত সম্পদ-মূল্যের পার্থক্য বিস্তর। অনুসন্ধানে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, তার স্ত্রী সৈয়দা হাসিনা সুলতানা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে বিপুল অর্থ-সম্পদের সন্ধান পেয়েছেন দুদক কর্মকর্তা। এর মধ্যে খিলগাঁওয়ে কিছু স্থাবর সম্পত্তির কথা সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করলেও ১১৭ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে ইউনিক হাইটসে চারটি অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত মূল্য দেখাননি মান্নান খান। দলিল মূল্য ১ কোটি ৮১ লাখ ৮৬ হাজার ৩৮৬ টাকা দাবি করলেও একেকটি অ্যাপার্টমেন্টের মূল্যই ২ কোটি টাকা হবে। গুলশান থানাধীন ভাটারা মৌজায় কেনা ৮ শতাংশের প্লটের প্রকৃত মূল্য তিনি গোপন করেছেন। প্লটটির দলিল মূল্য মাত্র ২৩ লাখ টাকা দেখানো হলেও সঠিক মূল্য হবে প্রায় দুই কোটি টাকা। খিলগাঁও গজারিয়া মৌজায় ২০১১ সালে ১৫ শতাংশ জমি কিনে মান্নান খান দলিল মূল্য দেখিয়েছেন ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অনুসন্ধানে এর মূল্য বেরিয়ে আসে দেড় কোটি টাকা। গুলশানের বড় বেরাইদ মৌজায় ৬০ শতাংশ জমি থেকে ২৯ শতাংশ জমির এওয়াজ বদল করলেও অবশিষ্ট ৩১ শতাংশ নিজের মালিকানায় রেখে দেওয়ার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেননি। বাজার দর অনুযায়ী যার মূল্য আসে আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকা। ২০১২ সালে মান্নান খান ব্যাংক ঋণ শোধ করেছেন পৌনে ১২ লাখ টাকা, যা তার বৈধ আয় থেকে শোধ করা ছিল অসম্ভব। হলফনামায় ১ কোটি ৪৪ লাখ ৬৩ হাজার ২২৭ টাকার উৎস দেখিয়েছেন মৎস্য চাষ থেকে। তার স্ত্রী সৈয়দা হাসিনা সুলতানা গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও হলফনামায় উল্লেখ করেছেন ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবে। মৎস্য খাত থেকে স্ত্রীর আয় দেখান ৮৫ লাখ টাকা। দুদক অনুসন্ধানে মান্নান খান বা তার স্ত্রীর নামে কোথাও কোনো মৎস্য খামারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সম্পদের তথ্য গোপন করায় মান্নান খান দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় মামলার সুপারিশ থাকতে পারে চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে। চলতি মাসেই এ প্রতিবেদন দুদকে দাখিলের সম্ভাবনা রয়েছে। জানতে চাইলে দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসির উদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দুদকের অনুসন্ধান এখন শেষ পর্যায়ে। শীঘ্রই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়বে বলে আমরা আশাবাদী।’ সূত্র জানায়, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে মান্নান খানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অর্থের বিনিময়ে সরকারি বাড়ি হাতছাড়া করা। সরকারি প্লট, ফ্ল্যাট বরাদ্দে দুর্নীতি-অনিয়ম, রাজউকের বিভিন্ন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দসহ নানা ক্ষেত্রে তার দুর্নীতি ধরা পড়ে। একজন অপেশাদার আইনজীবী থেকে তিনি রাতারাতি হয়ে ওঠেন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তিনি যে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন, তাতে পাঁচ বছরে তার সম্পদ বেড়ে দাঁড়ায় ১০৭ গুণ। বিষয়টি নিয়ে টিআইবি, সুজনসহ দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা সোচ্চার হলে দুদক ওই হলফনামা ধরে গত ২২ জানুয়ারি মান্নান খানের সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। সাবেক এ প্রতিমন্ত্রীকে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তলব করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। তিনি ২৭ ফেব্রুয়ারি দুদকে হাজির হন। টানা তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মান্নান খান এ সময় সমুদয় অর্থই আয়কর নথিতে প্রদর্শন করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে কীভাবে এ অর্থ উপার্জন করেছেন তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। বাংলাদেশ প্রতিদিন
