স্টাফ রিপোর্টার ॥ অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির ঝিমিয়ে পড়া ও নবাগত নেতাকর্মীরা মূল্যায়ন না পাওয়ায় তৃণমূল শক্তি হারাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রতিনিয়ত বিরোধী জোটের প্রতিরোধের মুখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তৃণমূল। জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মার খাচ্ছেন নেতাকর্মীরা।
মাঠের শক্তি দিয়ে সরকারি ও দলীয়ভাবে বিরোধী জোটকে মোকাবেলা করে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনা করছে ক্ষমতাসীন দলটি। এখন সরকার গঠনের নবম মাস চলছে। প্রথম মেয়াদে কিছুটা ভালো থাকলেও দ্বিতীয় মেয়াদে সাংগঠনিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। দলটির সিনিয়র নেতারা ব্যস্ত সরকারে। মধ্যম সারি ভূগছেন সিদ্ধান্তহীনতায়। এ অবস্থায় বেশ অস্বস্তি ও অশান্তিতে রয়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। অনেক জায়গায় প্রতিপক্ষের হামলায় প্রাণও দিতে হচ্ছে অনেককে।
কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন এ দলটির সারা দেশের জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে গত দশ বছরেও কমিটি হয়নি। হয়নি কোনো সম্মেলনও। অথচ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর অন্তর অন্তর সম্মেলন ও কমিটি করার কথা রয়েছে। জেলা ও থানাগুলোতে কমিটি না হওয়ায় মূল্যায়ন পাচ্ছেন না তরুণ ও উদীয়মান মেধাবী নেতারা। তাদের অনেকে আশাহত হয়ে বিমুখ হয়ে যাচ্ছেন রাজনীতি থেকে।
এ অবস্থায় দলের তৃণমূল শক্তি ক্রমশ ক্ষয় হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বিরোধী জোটের হাতে মার খাচ্ছেন নেতাকর্মীরা, প্রাণ দিতে হচ্ছে অনেককে। গত মে মাস থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার মাসে খুন হয়েছেন অর্ধশতাধিক তৃণমূল কর্মী। এখনও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সর্বশেষ সোমবার ৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নুরে আলম, ৭ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর রামগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, ৬ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাটে আওয়ামী লীগ নেতা ফিরোজ আলী মুন্সি ও ৪ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় মোজাম্মেল হোসেন ওরফে মোজাম সিকদারকে হত্যা করা হয়েছে। এভাবে সাংগঠনিক বিপর্যয়ে পড়ছে ক্ষমতাসীন দলটি।
দলের এ বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে বলে বাংলানিউজকে নিশ্চিত করেছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, আমাদের সিনিয়র নেতারা সরকারের ব্যস্ত। সংগঠন ও এলাকায় সময় দিতে না পারায় দল কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করছি। বিকল্প ব্যবস্থা কী?- এ বিষয়ে খোলাসা করেননি জয়। তবে নিজেই দলের তৃণমূলকে চাঙ্গা করতে জেলায় জেলায় সফর করবেন বলে জানান তিনি।
দলীয় নেতাদের হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দুষলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে সাংগঠনিক বিপর্যয়ের কোনো সুরাহা দিতে পারেননি তিনি।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন জানান, তাদের কোনো সাংগঠনিক দুর্বলতা নেই। যেসব জেলায় কমিটি নেই, এ মাসের মধ্যেই কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে। আর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, এটা লোকাল সমস্যা। একেবারে অপরাধমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা তো সম্ভব নয়! তৃণমূলের এ হত্যাকাণ্ডগুলো বিভিন্ন কারণে হয়। কারণগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সবকিছু আওয়ামী লীগের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সকলকে এগিয়ে আসতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, গুণীজনদের সন্মান না দিলে গুণী জন্মায় না। বাংলাদেশের প্রাচীন ও বৃহৎ এ দলে তরুণ ও মেধাবীরা ঠাই না পেলে তারা রাজনীতি বিমুখ হবেন- এটাই স্বাভাবিক! প্রবীণদের ঝিমিয়ে পড়ার কারণে সাংগঠনিক দুর্বলতায় এখন যে ক্ষতির সম্মুখীন দলটি, ত্বরিত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এর মাত্রা আরও বাড়বে।
