বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে নতুন নির্বাচন দেওয়ার পুরনো দাবিতে অনড় থেকেই শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে অনেক বিষয়ে নতুন কথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের ওই সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার নতুন বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীজোটের আন্দোলনের সফলতা বিষয়ে তার আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা।
জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতর মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য এলেও খালেদা জিয়া নিজের অবস্থান প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করেন শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনেই। তিনি সরাসরি মামলার কথা উল্লেখ না করে বলেন, ‘ক্ষমতাসীনেরা প্রতিনিয়ত আমাকে জেল-জুলুম ও ফাঁসির ভয় দেখাচ্ছে। নানাভাবে হেনস্থা করছে। আমাদেরকে টার্গেট করে অশ্রাব্য ভাষায় অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসবে কোনও লাভ হবে না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণে দ্রুত একটি নির্বাচনের আয়োজন করলেই কেবল চলমান সংকটের সুরাহা হবে।’
শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের জন্যই ২০-দলীয় জোট আন্দোলন করছে বলে এতদিন সরকারপক্ষ থেকে দফায়-দফায় যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে সে বিষয়েও কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘জীবনের এই প্রান্তে ক্ষমতা আমার কাছে বড় কিছু নয়। দেশবাসীর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে আমি অতীতে কয়েকবার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছি। প্রিয় সেই দেশবাসীর জন্য তাদের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতেই আমরা লড়াই করছি। এই আন্দোলন কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তির নয়। কোনও দলের বিরুদ্ধে কোনও দলের নয়। এ আন্দোলন আদর্শের। এ আন্দোলন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। এ আন্দোলন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকলের। আজকের এই আন্দোলন ক্ষমতা দখলের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার আন্দোলন। স্বাীনতার ঘোষণাপত্রে যে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছে, তার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। দেশের মালিকানা আমরা তাই দেশের মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই। যাতে ভোটের অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তারাই সিদ্ধান্ত দিতে পারে, তাদের পক্ষে কারা দেশ পরিচালনা করবে।’
২০-দলীয় জোটের সংলাপ-সমঝোতার আহ্বান ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় এ বিষয়ে সরকার কী করতে পারে, শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে তারও একটি ধারণা দিয়েছেন খালেদা জিয়া। তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ক্ষমতাসীনরা যদি কোনও আলোচনা করতে না চায়, তাহলে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব এককভাবে তাদের ওপরেই বর্তাবে। তথাকথিত হলেও একটি সংসদের অধিবেশন চলছে। একতরফাভাবে যে বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী তারা পাশ করেছে, তা তারা একতরফাভাবে বাতিলও করে দিতে পারে। তাতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ খুলবে। এই সংশোধনীর পর বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেই দেশে সংকটের অবসান ঘটবে।’
বাংলাদেশের ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস ঐক্যবদ্ধভাবে পালনেরও নতুন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, ‘সংকট নিরসনের জন্য ১৯৯৬ সালে আমরা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন করে সংবিধান সংশোধনের পর পদত্যাগ করে আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করেছিলাম। এখন শেখ হাসিনা অন্তত একবার যদি তার অঙ্গীকার পূরণ করেন, তাহলেই দেশে শান্তি, স্বস্তি ও সমঝোতার পরিবেশ ফিরে আসবে। মানুষ মুক্তি পাবে। সামনে মহান স্বাধীনতার দিবস। জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে, জনগণের স্বাধীনতা এবং মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের তেমন জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। আজকের সংকট সমাধানের চাবিকাঠি ক্ষমতাসীনদের হাতে। সংকট নিরসনের মাধ্যমে তারা সেই কাক্সিক্ষত জাতীয় ঐক্যের পথ খুলে দিতে পারে। তাহলেই আমরা সংকটমুক্ত হয়ে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতির ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস পালন করতে পারব।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অভিযোগ করে শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ২০-দলীয় জোটের আন্দোলনবিষয়ক ভুলও স্বীকার করেছেন খালেদা জিয়া। তিনি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সমালোচনাশেষে বলেছেন, ‘মহাকারসাজির নির্বাচনী প্রহসনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে এটি একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। শেখ হাসিনা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে একটা সমঝোতা হলে সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের অঙ্গীকারও করেছিলেন। তাদের প্রতিশ্রুতির কারণে ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর পর আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার কথা বিশ্বাস করে আমাদের সেই সিদ্ধান্ত নেয়া যে সঠিক ছিল না, তা আমরা অচিরেই বুঝতে পারি।’
বিরোধীমত দমনে সরকারপক্ষ জার্মানির নাৎসী নেতা হিটলারের পথ অনুসরণ করেছে বলে খালেদা জিয়া যে অভিযোগ করেছেন, তাও ছিল তার নতুন বক্তব্য। তিনি বলেছেন, ‘জার্মানির নাৎসী নেতা হিটলার ১৯৩৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাইখস্ট্যাগে আগুন লাগিয়ে সেই দায় বিরোধীদের ওপর চাপিয়ে অনুগত মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এরপর নির্মম ও নিষ্ঠুর পন্থায় বিরোধী দল ও মতকে তিনি দমন করেছিলেন। বাংলাদেশে হিটলারের ক্ষুদে প্রেতাত্মারা আজ সেই পথ অনুসরণের ব্যর্থ অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এসব অপতৎপরতায় হিটলারের যেমন শেষ রক্ষা হয়নি, তার অনুসারী বাংলাদেশি ক্ষুদে হিটলাররাও চূড়ান্ত বিবেচনায় পরাজিত হবে।’
বিএনপি হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না জানিয়ে খালেদা জিয়া শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, ‘বিএনপি ও ২০ দল নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার ভয়ঙ্কর রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আমাদের আন্দোলন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। তাদের জীবননাশের আন্দোলন নয়। কাজেই পক্ষপাতহীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে জীবনসংহারী সন্ত্রাসের প্রকৃত হোতাদের শনাক্ত করে কঠিন শাস্তির দাবি আমি পুনর্ব্যক্ত করছি।’ এসব ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তিবিধানকল্পে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিও প্রথমবারের মতো গতকালই জানিয়েছেন খালেদা জিয়া।
বিএনপি চেয়ারপারসন সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে বোমা মেরে ও পুড়িয়ে হত্যা এবং এ নিয়ে বিরোধীদলের বিরুদ্ধে প্রচারণা এবং নির্যাতন চালিয়ে ক্ষমতাসীনরাই সুবিধা পাবে। কাজেই ক্ষমতাসীনেরা সুবিধা পায় এমন কোনো অপকর্মে আমাদের কেউ জড়িত থাকার প্রশ্ন ওঠে না। বিএনপি হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে হত্যা ও সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের বর্তমান আন্দোলন চলাকালে সরকার বিভিন্ন হিংসাত্মক পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। সরকারের এই দমন-পীড়ন জাতীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’ বেঙ্গলিনিউজটোয়েন্টিফোর.কম
