Skip to content

রাজস্ব প্রশাসনে ক্ষোভ অস্থিরতা

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শীর্ষ কর্মকর্তার অদক্ষতা, স্বেচ্ছাচারিতা আর ক্ষমতার অপব্যবহারে ভয়াবহ রাজস্ব বিপর্যয়ের মুখে এখন সরকার। এ নিয়ে অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রীই ক্ষুব্ধ। পরিকল্পনাহীনভাবে রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি এখন প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক সব খাতই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি মাসেও কমপক্ষে আড়াই হাজার টাকা ঘাটতি হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্যরাই। তারা বলছেন, এতে সরকারের কোষাগারে অর্থ সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও মুখ থুবড়ে পড়বে।
মাঠপর্যায়ে রাজস্ব সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত এমন কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সঠিক নির্দেশনার অভাব, সবকিছুতে এককেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত, আয়কর, ভ্যাট আর শুল্ক আদায়ে সমন্বয় না থাকা, কর্মকর্তাদের অহেতুক হয়রানি, কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা, কমিশনারদের কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং পারস্পরিক আস্থার অভাবে রাজস্ব সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সর্বত্র ক্ষোভ আর অস্থিরতা বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা নেই। অথচ রাজস্ব আদায়ে মাঠপর্যায়ের তদারকিই প্রধান। এছাড়া শুল্ক, ভ্যাট আর আয়কর সম্পর্কিত জটিল বিষয়ে তার অজ্ঞতা, মাত্রাতিরিক্ত বিদেশ ভ্রমণ করা, সভা সেমিনার এবং পরিদর্শনের নামে সারা দিন বাইরে থেকে শেষ বিকেলে এনবিআরে এসে গভীর রাত পর্যন্ত অফিস করা, কর্মকর্তাদের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ, উদ্বুদ্ধ না করে কথায় কথায় হুমকি ও তার দূরদৃষ্টির অভাবেই মূলত রাজস্ব আদায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একাধিক সদস্য যুগান্তরকে জানান, রাজস্ব বোর্ডে এখন কোনো নিয়ম শৃংখলা নেই। এভাবে আতংক, ক্ষোভ, অসন্তোষ নিয়ে কাজ করা যায় না। চেয়ারম্যান কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তার বলয়ে বন্দি। রাজস্ব প্রশাসনের অধিকাংশকে উপেক্ষা করে তিনি সেসব কর্মকর্তার পরামর্শেই কাজ করে যাচ্ছেন। করদাতা থেকে শুরু করে সবার বিরাগভাজন হচ্ছেন। এছাড়া এনবিআরের সদস্য থেকে শুরু করে কমিশনারদের সঙ্গে চেয়ারম্যানের আচরণও আপত্তিকর। এ নিয়ে মুখ খুললেই চাকরি থেকে বিদায়ের যে প্রক্রিয়া চলছে তা কোনোভাবেই মানা যায় না। বাস্তবতা হচ্ছে এনবিআরের অধিকাংশ সদস্যেরই কোনো ক্ষমতা নেই, কাজ নেই। অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদ মর্যাদার ১৬ বোর্ড সদস্যকেই ক্ষমতাহীন করে চেয়ারম্যানের একক নিয়ন্ত্রণে চলছে রাজস্ব প্রশাসন।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে সংস্থাটি আয় করেছে ৩০ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ৩৬ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রথম প্রান্তিকে ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। এছাড়া পুরো অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও প্রথম প্রান্তিকে অর্জন হয়েছে ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। এই চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও এসব বিষয়ে অবগত। সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপি এনবিআর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। অর্থমন্ত্রী বিষয়টি গোপন রাখেননি। মঙ্গলবার তিনি স্বীকার করেছেন, রাজস্ব প্রশাসনে পরিবর্তন আনার কারণে কর্মকর্তাদের কারও কারও মধ্যে অসন্তোষ থাকতে পারে। আমলাদের মধ্যে এক ধরনের গ্রুপিং-ট্রুপিংও থাকে। অর্থমন্ত্রী বলেন, এনবিআর আগে যেভাবে চলত, এখন হয়তো সেভাবে চলছে না। আমি এনবিআরের চেয়ারম্যানকে এসব ছোটখাটো বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে বলেছি এবং রাজস্ব আদায়ের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলেছি।
অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম রাজস্ব আদায় হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এটা ব্যাড সিগন্যাল। আই অ্যাম আনহ্যাপি। আর এ পরিস্থিতির জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে দায়ী করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমার অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন এত কম রাজস্ব আদায় আগে কখনও হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি আজই (মঙ্গলবার) এনবিআরের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বসব।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক চেয়ারম্যানের কথায় চলছে পুরো প্রশাসন। সবকিছুই তিনি করছেন খেয়ালখুশিমতো। সদস্য, কমিশনার থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের কর্মকর্তারাই অজানা আতংকে ভীতসন্ত্রস্ত। পান থেকে চুন খসলেই চেয়ারম্যান চাকরি হারানোর ভয় দেখান। যারাই প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছেন তাদেরই তিনি চাকরি থেকে বিদায় করাসহ শাস্তিমূলক পোস্টিং দিয়ে শায়েস্তা করেছেন। এসব কারণে ভয়ে কথা বলার কেউ নেই এনবিআরে। চেয়ারম্যানের বিরাগভাজন হতে চান না কেউ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজস্ব আদায়ের চেয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অজানা আতংক। পরস্পরের প্রতি কোন্দল আর অসন্তোষেই চলছে রাজস্ব প্রশাসন। এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে নজিবুর রহমান যোগ দেয়ার পর থেকেই সব নিয়ম শৃংখলা ভেঙে পড়েছে। বোর্ড সদস্যদের ক্ষমতাহীন করে রাখা, কথায় কথায় বিদায় করে দেয়া বা পদাবনতির আতংক আর অপরিকল্পিতভাবে রাজস্ব আয়ের চেষ্টাই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন কমিশনার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজস্ব সভার নামে সব কমিশনারকে এনবিআরে ডাকা হয়। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয়। সভা শুরু হলে একটানা চলে। নামাজের সময়ও বিরতি দেয়া হয় না। এসব মিটিংয়ে কাজের কথা হয় খুবই কম। কমিশনারদের কথা বলতে না দিয়ে চেয়ারম্যান নিজেই একতরফা কথা বলে যান, যা সবার জন্যই বিরক্তিকর। প্রকাশ্য সভায় তিনি সদস্য থেকে শুরু করে কমিশনারদের যেভাবে হেনস্থা করেন তা অত্যন্ত অশোভন।
আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত একাধিক বড় ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, এনবিআরের বর্তমান চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান মোটেও শিল্পায়ন এবং ব্যবসাবান্ধব নন। তিনি ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার পরিবর্তে হয়রানি করতেই বেশি পারদর্শী। তিনি কর ও রাজস্ব নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইঁদুর বিড়াল খেলা খেলছেন। পরিণতিতে দেশকে বঞ্চিত করছেন বড় অংকের রাজস্ব থেকে। ক্ষতি করছেন উদীয়মান উদ্যোক্তাদের। যারা দেশের শিল্প ও ব্যবসা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। তিনি সবাইকে চোর ভাবেন এবং সবকিছুই নেতিবাচক চোখে দেখেন।
সূত্রমতে, রাজস্ব ঘাটতির চিত্র যাতে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ না পায় সেজন্য লুকোচুরির আশ্রয় নেন তিনি। সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়, রাজস্ব ঘাটতির চিত্র প্রকাশ পেলে কারও চাকরি থাকবে না। এমনকি বোর্ড সদস্যদেরও রাজস্ব আদায় বিষয়ে অন্ধকারে রাখা হয়। প্রতি মাসে রাজস্ব আদায় পর্যালোচনা বৈঠক হলেও সেখানে রাজস্ব আয়ের কৌশল নিয়ে কথা হয় না। কোন কমিশনারেট ভালো করেছে, না খারাপ করেছে তা পর্যালোচনা হয় নামমাত্র। সভার অধিকাংশ আলোচনাই থাকে চেয়ারম্যানের কৃতিত্ব আর গুণগান নিয়ে। সভা সেমিনার বা তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে। এজন্য রাজস্ব আদায়ের মূল দায়িত্ব পালনকারী কমিশনাররাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
অপরদিকে গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের সাফল্য নিয়েও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। সংবাদ সম্মেলন ডেকে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের দাবি করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। অথচ তা সঠিক নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। মূল রাজস্ব আয়ে গত বছর বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়ে সরকার। গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। অর্থবছরের জুন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাপক ঘাটতির মুখে এনবিআরের চাপে অর্থ মন্ত্রণালয় ১৪ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করা হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকায়। এ ধরনের সংশোধনও নজিরবিহীন। অতীতে লক্ষ্যমাত্রা কমানো মাত্র কয়েক হাজার কোটিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত অর্থবছরে কমানো হয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ ব্যয় নির্বাহে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংস্থানের লক্ষ্য প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা; গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। অথচ গত ৩ মাসে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র সাড়ে ৯ শতাংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির রাজস্ব আয় দূরের কথা এর অর্ধেক অর্জন হবে কিনা সে নিয়েও গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫