Skip to content

ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ন ওষুধে বাজার সয়লাব : মান নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদ্যোগ নেই

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ন ওষুধে পুরান ঢাকার ওষুধ পল্লী খ্যাত মিটফোর্ডের দোকানগুলো সয়লাব হলেও এ ব্যাপারে কারো কোনো নজর নেই। রাজধানীর মিটফোর্ড রোডে সারি সারি কেমিক্যালের দোকান। বেশির ভাগই ওষুধ তৈরির কাঁচামালের।

কোথাও বা ফুটপাতের ওপর পসরা সাজিয়ে বসেছে বিক্রেতারা। ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ, কোনো ওষুধের কাঁচামালের কমতি নেই। আর এসব কাঁচামালের ক্রেতা বিভিন্ন ওষুধ তৈরির ছোটবড় কারখানা। শুধু তাই নয়, এখানে অবাধে মেলে ভেজাল ও নকল ওষুধ। র‌্যাব-পুলিশ আর ঔষধ প্রশাসনের কদাচিৎ অভিযানে অবৈধ কাঁচমাল বা ভেজাল ওষুধের রমরমার প্রমাণ মেলে। পুরান ঢাকার ওই অঞ্চল বাদ দিলেও দেশের অন্যান্য স্থানের ফার্মেসিতে থাকা ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন চারদিকে। রোগ থেকে বাঁচার জন্য ওষুধ খেতে গিয়ে ওই ওষুধই এখন মানুষের জন্য বড় বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিষাক্ত প্যারাসিটামলে ২৮ শিশু হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা থেকে সম্প্রতি রিড ফার্মার সব আসামি খালাস পাওয়ার পর শুধু ওষুধের মান নিয়েই নয়, ঔষধ প্রশাসনের বহুমুখী ব্যর্থতার চিত্র নতুন করে ফুটে উঠেছে।

দেশের ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন করতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনীর উদ্দীন পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। বললেন, ‘এককথায় বলতে গেলে কিছুই দেখে না ঔষধ প্রশাসন।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোন ওষুধ বানাতে চান আপনি? সবই পাবেন হাতের নাগালে। কাঁচামালের অভাব নেই ঢাকার মিটফোর্ড মার্কেট কিংবা ফুটপাতের ছোটখাটো দোকানে! কিভাবে এসব কাঁচামাল মিটফোর্ডে যায়?’

মুনীর জানান, ঔষধ প্রশাসন এতটাই অকার্যকর যে কোন কোম্পানি কোন আইটেমের কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন নেয় আর কতটুকু আমদানি করে কিংবা আমদানীকৃত কাঁচামালের কতটুকু নিজেরা ব্যবহার করে, কতটুকু চোরাপথে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়, এর কোনো হিসাব নেই। কোনো মনিটরিং নেই। ওষুধ কম্পানির পক্ষ থেকে ঔষধ প্রশাসনের কাছে যে কাগজ ধরিয়ে দেয়, সেটাই সব। ফলে এক শ্রেণির অসাধু ওষুধ কম্পানি বিভিন্ন ওষুধ তৈরির লাইসেন্স নিয়ে বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে নিজেরা নামমাত্র ওষুধ বানায়, বাকি কাঁচামাল অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে ওই কাঁচামালে ভেজাল মিশিয়ে অনেকেই তৈরি করে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ। ওই ভেজাল কাঁচামাল আবার প্রকাশ্যে বিক্রিও হয়।

ওই ওষুধ বিশেষজ্ঞের এমন তথ্যের সঙ্গে সহজেই মিলে যায় চিকিৎসকদের মতামতও। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন সিনিয়র চিকিৎসক অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়েই বললেন, ‘ওষুধে কাজ না হলে মানুষ দোষ দেয় আমাদের, ডাক্তারের; কিন্তু ওষুধের মান যদি ঠিক না থাকে, তাহলে ডাক্তারের কী করার আছে, ডাক্তার কি আর ওষুধ বানিয়ে দেয়?’

কিন্তু পরক্ষণেই আবার নিচু গলায় বলেন, ‘ভাই, আমার নামটা লেইখেন না। বোঝেন তো সরকারি চাকরি করি, আর অল্প কিছুদিন চাকরি আছে, ওষুধ কম্পানির লোকেরা এতটাই প্রভাবশালী যে তারা আমাকে চাইলে যেকোনো ক্ষতি করে ফেলতে পারে। ’

একই কক্ষে বসা আরেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গলা বাড়িয়ে বলেন, ‘আপনারা তো কথায় কথায় বলেন—কেন আমরা বেশি বেশি ওষুধ লিখি আর বেশি পাওয়ারের ওষুধ দিই! আরে ভাই, কম ওষুধে কাজ হতে চায় না। মানুষ উপকার পায় না। ওষুধের মান যদি ঠিক রাখা না যায়, তবে বেশিসংখ্যক আর বেশি পাওয়ারের ওষুধ না দিয়ে উপায় থাকে না। ’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ফাইল ঘেঁটে বলেন, ‘বছরের পর বছর কেবল কি নিম্নমানের ওষুধ বানানোর প্রশ্রয়ই দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর? কতগুলো কম্পানির লাইসেন্সের মেয়াদ বহু আগে শেষ হয়ে গেলেও সেগুলো নবায়ন হয়নি। কিন্তু তারা ঠিকই ওষুধ উৎপাদন, বাজারজাত—সব কাজ ঠিকই করে যাচ্ছে। কোনোটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১০ বছর আগে আবার কোনোটির শেষ হয়েছে দুই-তিন বছর বা দুই-তিন মাস আগে। আর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কেবল সেগুলোতে লাল কালিতে চিহ্নিত করে দায়িত্ব শেষ করছে। ’

জানতে চাইলে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একটি ওষুধ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা অনেকেই লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়নের আবেদন করি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ওষুধ প্রশাসনের লোকজন আমাদের নানা হাতিঘোড়া দেখায়। পরিদর্শনের নামে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর পার করে দেয়। আর এর দায় পড়ে আমাদের ওপর। বিভিন্ন অজুহাতে ঝুলে থাকতে হয় আমাদের। ’

এদিকে ২৮ শিশুর হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা থেকে সম্প্রতি রিড ফার্মার সব আসামি আদালতে খালাস পাওয়ার পর ওষুধ প্রশাসনের ব্যর্থতার আরেক নজির মিলে যায়। আর আদালত থেকে এমন ব্যর্থতার কথা তুলে ধরায় অন্যান্য ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে এটাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের কাছে এ বিষয়টি এখন এটি বড় প্রশ্নবোধক হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আগে থেকেই রয়েছে। এমনকি খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণহীন থাকায় বারবারই বিরক্তি প্রকাশ করছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহাবুব বলেন, ওষুধে দেশ যতটা এগিয়েছে এর সাফল্য দেশের মানুষ ঠিক ওই মাত্রায় ভোগ করতে পারছে না ওষুধ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাবে। ওষুধ কম্পানিগুলো ওষুধকেও অন্য সব পণ্যের মতোই শুধু মুনাফার উপায় হিসাবে দেখে। তাদের এই মানসিকতার জন্যই আজ দেশের ওষুধের মান নিয়ে এত প্রশ্ন। সেই সঙ্গে ওষুধ প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও। আমাদের সময়.কম

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫