বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
সন্ত্রাসবাদের উচ্চ ঝুঁকির শহর হিসেবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের জন্য শহরটি উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা হুমকি এলাকা। বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগ-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। দেশটিতে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকিও গ্রহণযোগ্য মাত্রায় কমেনি। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) সাধারণ নিরাপত্তা মানে পৌঁছাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটির (ওসাক) এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটি গত শনিবার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সহায়তায় করা ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত এক বছরে বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লেও তা আন্তর্জাতিক সূচক বিবেচনায় সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া হত্যা-ধর্ষণসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে গত এক বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। গুলশান এলাকায় একাধিক রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থাকার কথা উল্লেখ করে সংলগ্ন সড়কে চলাচল না করতে কূটনীতিক ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিমানবন্দর দিয়ে চলাচল ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ওই দেশের নাগরিকদের বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়।
সন্ত্রাসবাদের উচ্চ ঝুঁকি প্রমাণ করে গুলশান হামলা :ওসাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঢাকাকে তাদের কূটনীতিকদের জন্য বড় নিরাপত্তা হুমকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ক্ষেত্রে শহরটি ঘিরে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আরও বলা হয়, বাংলাদেশের ভেতরে সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে তাদের কার্যক্রমে তথ্যউপাত্ত মিলেছে। বিগত বছরগুলোয় দেশটি একাধিক সন্ত্রাসী হামলার অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল। বিদেশি নাগরিক, শিয়া, আহমদিয়া, হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলা হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারিতে ভয়াবহ হামলা বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের উচ্চ ঝুঁকিকেই প্রমাণ করে। ২০১৫ সালের জানুয়ারির পর থেকে সংঘটিত বিভিন্ন হামলার ঘটনায় ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়দার শাখা একিউআইএস ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস দায় স্বীকার করে বিবৃতিও দিয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক কর্মকর্তা তার বন্ধুসহ নিহত হন। তখন একিউআইএস ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এ হত্যার দায় স্বীকার করে। আল কায়দার প্রচার শাখা গ্গ্নোবাল ইসলামিক মিডিয়া ফ্রন্ট (জিআইএমএফ) আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে একীভূত হয়ে কাজ করছে বলেও তথ্য রয়েছে। গত বছরের শুরুতেই জিআইএমএফ বাংলা টিম তাদের আগের হামলাগুলোর তালিকাও প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন অজুহাত সৃষ্টি করে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে, যা উদ্বেগজনক। আরও বলা হয়, দেশটিতে বিভিন্ন উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর পশ্চিমাবিরোধী বিদ্বেষমূলক প্রচার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এ ছাড়া আইএস বাংলাদেশে নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন ফাঁকফোকর খুঁজছে। এ কারণে বাংলাদেশে আগতদের ঝুঁকি রয়েই গেছে।
সড়ক যোগাযোগে নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রবল: প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকির পরই বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগে নিরাপত্তা ঝুঁকি সবচেয়ে প্রবল। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহর ও মহাসড়কে বেশিরভাগ চালকই ট্রাফিক আইন মেনে চলেন না। চালকদের বেপরোয়া মনোভাব অত্যন্ত বেশি। তা বন্ধেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা আইনের প্রয়োগ নেই। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। সড়কে চলাচলের ঝুঁকি এতটাই প্রবল যে একজন চালক সতর্ক থাকলেও অন্যদের অসতর্কতার কারণে মর্মান্তিক প্রাণহানিকর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একই সঙ্গে রেলে চলাচলের ক্ষেত্রে রেলপথও খুব বেশি নিরাপদ নয়। অনেক স্থানেই রয়েছে অনিরাপদ লেভেল ক্রসিং, সেখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে রেললাইন ও সেতুগুলোও বিপজ্জনক অবস্থায় দীর্ঘদিন রয়েছে। ওই সব স্থানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রবল থাকলেও তার মধ্যেই রেল দিনের পর দিন চলাচল করছে। কয়েকটি ফেরিঘাটের কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, ওই সব স্থানে যানবাহন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ওঠা-নামা করছে।
সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি সহনীয়: বাংলাদেশে গত এক বছর ও কিছু বেশি সময়ে অনলাইনে কেনাকাটা, অনলাইন ব্যাংকিংসহ ই-কমার্সের বিভিন্ন কার্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলেও তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকের বিচারে সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করেনি। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারে অনিরাপদ তারবিহীন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে এসব নেটওয়ার্ক ব্যবহারে ব্যক্তির অনলাইন কার্যক্রমে গোপনীয়তা ও তথ্য চুরির ঝুঁকি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতার মাত্রাও আশানুরূপ নয়। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করাই ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিষয়ে বলা হয়, যাত্রীদের আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া লাগেজ হারানো, গুরুত্বপূর্ণ মালামাল চুরির ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে।
সামাজিক অপরাধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে: প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাদকদ্রব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধের বিস্তৃতি থাকলেও এর ব্যাপকতা নিয়ন্ত্রণে আছে। সামাজিক নানা অপরাধের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে এলেও তা নিয়ন্ত্রণে আছে। সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বড় নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। সমকাল
