বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ কৃষক পাচ্ছেন না পাটের ন্যায্যমূল্য। পাটকলগুলোতে বেড়েছে উত্পাদন ব্যয়। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে রফতানিতেও নেমেছে ধস। টাকার অভাবে ধুঁকছে সরকারি পাটকলগুলো। এছাড়া পাট রফতানিতে নগদ সহায়তা দেওয়া হলেও সরকার অর্থ পুরোপুরি ছাড় না করায় উদ্যোক্তাদের হতাশা আরও বেড়েছে। উল্টো প্রতিবেশী দেশ ভারত সরকার এ খাতের উদ্যোক্তাদের নানা রকম সুবিধা দেওয়ায় বাংলাদেশের বাজার দখল করছে দেশটি।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, সোনালি আঁশ পাটের সুদিন ফেরার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা হয়তো হারাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর এর জন্য সরকারের উদাসীনতাই বেশি দায়ী বলে মনে করছেন তারা। এ প্রসঙ্গে কৃষি বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব হোসেন বলেন, কয়েক বছর ধরে আমরা লক্ষ করছি কৃষক পাটের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এতে করে ফসল উত্পাদনে যে খরচ হচ্ছে তা তুলতে পারছেন না তারা। বাধ্য হয়ে কৃষকরা অন্য ফসল আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। এ কারণে সবার আগে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। বছরের অন্যান্য সময় পাটের মণ ২ হাজার টাকার ওপরে উঠলেও কৃষক কেন ১ হাজার টাকায় বিক্রি করবেন? আসলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণেই কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছেন। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের কবল থেকে কৃষককে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের। এর জন্য সরকারের উচিত বিজেএমসির মাধ্যমে
বেশি করে পাট কেনা।
পাটকল সূত্রগুলো জানায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় দেশে পাটের উত্পাদন খরচ বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। নতুন করে ১০০ ভাগ বাড়ানো হয়েছে শ্রমিকদের মজুরি। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার মান বৃদ্ধির কারণে রফতানি আয় কমে যাচ্ছে। আগে ১ ডলারের বিপরীতে পাওয়া যেত ৮৪ টাকা। এখন নেমে এসেছে ৭৪ থেকে ৭৬ টাকায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পাটের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভারতের পাট চাষি এবং ব্যবসায়ীরা নানা রকম সুবিধা ভোগ করছেন। বাংলাদেশ জুট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, ভারতে পাটশিল্পকে সরকারিভাবে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাটশিল্পকে সহায়তা দেওয়ার জন্য মুদ্রানীতিতেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তারা ছয় মাস আগে ১ ডলারের বিপরীতে পেত ৪৬ টাকা। ভারতীয় রফতানিকে সহযোগিতা করার জন্য ডলারের বিপরীতে রুপির মান কমিয়ে এখন ৫৬ টাকা করা হয়েছে। ফলে ভারত ক্রমেই রফতানি শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশ সেখানে পাটজাত পণ্য রফতানি করে স্থানীয় মুদ্রায় রফতানি আয় কমছে। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে।
কাশেম জুট মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফউল্লাহ বলেন, সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের পাটের প্রধান বাজার মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি নতুন করে সঙ্কটে পড়েছে। এছাড়া ইরানে বাংলাদেশ থেকে ৭০ হাজার টন পাটজাত পণ্যের রফতানি বাজার থাকলেও তা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছি আমরা। এসব কারণে পাট রফতানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ দিন দিন সক্ষমতা হারাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত নতুন করে সক্ষমতা অর্জন করছে। ফলে তারা আস্তে আস্তে পাটের বাজার দখল করছে। কয়েক বছরের মধ্যে ভারতে ১০৩টি পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের পাটকল চালু রাখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি সরকার বেশকিছু বন্ধ পাটকল চালু করলেও তা চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
পাটের দাম কমে অর্ধেক হয়েছে: কৃষকের ঘরে যখন পাট আসে তখনই বাজারে দাম অর্ধেক পড়ে যায়। অফ সিজনে বাজারে প্রতিমণ পাট বিক্রি হয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। অথচ আগস্ট-সেপ্টেম্বরে নতুন মৌসুম শুরু হলেই প্রতিমণ পাটের দাম হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে দেশের বাজারে মানভেদে এ দরেই বিক্রি হচ্ছে পাট, যা দিয়ে কৃষকের খরচের অর্ধেকই উঠছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জমি চাষ থেকে শুরু করে পাট পচানো শেষে বাজারে আনা পর্যন্ত প্রতিমণ পাটে কৃষকের খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। অথচ পাট বিক্রি করতে হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। সবচেয়ে ভালো মানের পাট অবশ্য বাজারভেদে ১ হাজার ৪০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। সুতরাং প্রতিমণ পাটে চাষিদের লাভ তো নেই; বরং ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাট চাষির লাভ বলতে থাকে কেবল পাটখড়ি। আর পাট আবাদ করে লোকসান হওয়ায় পাট চাষ আবারও কমিয়ে দিয়েছেন চাষিরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. কামাল উদ্দিন জানান, স্বাধীনের পর দেশে ৭ থেকে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হতো। অথচ ১৯৯০ সালের পর থেকে পাটের আবাদ কমতে কমতে আড়াই লাখ হেক্টর থেকে ৩ লাখ হেক্টরে নেমেছিল। তবে ২০০৮ সাল থেকে আবারও পাট চাষ বাড়তে শুরু করে। এ বছর পাট চাষ হয় প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমিতে। তারপর থেকে প্রতি বছর বেড়েছে পাট চাষ। কিন্তু আগের বছর কৃষক ভালো দাম না পাওয়ায় আবার পাট চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে চলতি বছর পাট চাষ কমেছে প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমির। তিনি বলেন, কৃষক যদি পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে এ শিল্পটি আবারও ঘোর সঙ্কটে পড়বে।
টাকা চেয়ে পায় না বিজেএমসি: সরকারি পাটকলগুলো রীতিমতো ধুঁকছে। অতি পুরনো পাটকলগুলো সংস্করণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে সরকারের কাছে টাকা চেয়েও পাচ্ছে না বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি)। একই সঙ্গে পাটের মৌসুমে টাকার অভাবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেও পর্যাপ্ত পাট কিনতে পারছে না সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রসঙ্গে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হুমায়ুন খালেদ বলেন, বর্তমানে সরকারি পাটকল রয়েছে ২৭টি। এর মধ্যে চালু আছে ২৬টি। বন্ধ আছে নারায়ণগঞ্জের মনোয়ার জুট মিল। এসব পাটকল বহু দিনের পুরনো হওয়ায় এর সংস্কার করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। পাটকলগুলো সংস্কারের জন্য প্রায় দেড় বছর আগে সরকারের কাছে ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি টাকাও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এ কারণে বিজেএমসিকে গতশীল করা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রতিদিন ৭০০ টন পাটপণ্য উত্পাদন হচ্ছে সবগুলো কল থেকে। পাটকলগুলো সংস্কার করা হলে উত্পাদন ক্ষমতা বেড়ে ১ হাজার ২০০ টন থেকে ১ হাজার ৪০০ টন হবে।
এছাড়া সরকার বিজেএমসিতে কর্মরতদের বেতন বৃদ্ধি করেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। এতে ব্যয় বেড়েছে ৭০০ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েই বসে আছে। বেতন বৃদ্ধির একটি টাকাও দেওয়া হয়নি। বেতন বৃদ্ধির এ টাকা দেওয়া হচ্ছে বিজেএমসির হতবিল থেকেই। কেননা সরকার বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। বর্ধিত বেতন দিতে না পারলে এ শিল্পে অস্থিরতা দেখা দেবে। বিজেএমসি তা হতে দেয়নি।
হুমায়ুন খালেদ আরও বলেন, পাটের ভরা মৌসুমে পর্যাপ্ত টাকার অভাবে আমরা বেশি করে পাট কিনতে পারিনি। পাট ক্রয় বাবদ আমরা সরকারের কাছ থেকে ৫০০ কোটি টাকা চেয়েছিলাম। পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং অর্থ সচিবের সঙ্গে দেখা করে টাকার অনুরোধ করেছি। কিন্তু একটি টাকাও আমরা পাইনি। তিনি বলেন, বিজেএমসি বেশি করে পাট কিনতে না পারায় বাজারে পাটের দাম পড়ে গেছে। কৃষককে কম দামে পাট বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি জানান, এ মৌসুমে বিজেএমসি ১ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ২ লাখ কুইন্টাল পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রতি কুইন্টাল পাট ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে কেনা হচ্ছে। অর্থাত্ প্রতিমণ ১ হাজার ৪০০ টাকায় পাট কিনছে বিজেএমসি। তবে স্থানীয় বাজারভেদে একেক এলাকায় একেক দামে পাট কেনা হচ্ছে।
