জেলা প্রতিনিধি, পাবনা ॥ পাবনার চাটমোহরসহ বৃহত্তর চলনবিল অঞ্চলের অসহায়, সুবিধা বঞ্চিত শিশু ও যুবকদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে ‘নৌকা স্কুল’। ইতোমধ্যে নৌকা স্কুল সাড়া জাগিয়েছে চলনবিল অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এমনকি বিশ্বের পরিবেশবিদদের দৃষ্টি কেড়েছে এই স্কুল নৌকা। এতে শুধু পাঠদানই নয়, রয়েছে পাঠাগার ও ইন্টারনেট সুবিধাও।
নৌকা স্কুলে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কেও জানতে ও শিখতে পারছে চলনবিল অঞ্চলের শিশু শিক্ষার্থীরা। বিল বা নদী বেষ্টিত চলনবিল এলাকার শিক্ষার্থীদের এখন আর সরকারি স্কুলে যেতে হয় না। বরং নৌকা স্কুলই চলে আসে তাদের কাছে। এই বিশেষ ধরনের নৌকাতে শুধু বিদ্যালয়ই নেই, আছে পাঠাগার, ইন্টারনেট ক্যাফে, এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য বিশেষ সোলার প্যানেল।
চলনবিল অঞ্চলের নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিংড়া ও পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় বিশেষত সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কাছে এই নৌকা স্কুল এখন অত্যন্ত সুপরিচিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম। এলাকাগুলোর আত্রাই, নন্দনকুঞ্জা, গুমানি, করতোয়া আর বড়াল নদীর প্রায় ৫০টি ঘাটে লাগানো এই নৌকা স্কুল এখন চলনবিলের নি¤œবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রমে এনে দিয়েছে আধুনিক পাঠদানের এক পরিবর্তনের হাওয়া।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই শতকের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের অন্ততঃ ১৮ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। গৃহহীন হয়ে পড়বে কমপে ৩০ মিলিয়ন মানুষ। তাই পানিতে বেঁচে থাকার নানা উপায় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা চলছে। এমনি এক গবেষণায় এগিয়ে এসেছেন স্থপতি আবুল হাসনাত মোহাম্মদ রেজোয়ান। নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার নিজের গ্রাম সিঁধুলাইয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সিঁধুলাই স্ব-নির্ভর উন্নয়ন সংস্থা’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠন। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক রেজোয়ান নিজেই। তার সৃজনশীল চিন্তার ফসলই আজকের এই নৌকা স্কুল। এসব ভাসমান স্কুলে সপ্তাহে ৬ দিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় লেখাপড়া করে শিক্ষার্থীরা। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা তাদের বাড়ির ঘাট থেকেই নৌকা স্কুলে ওঠে।
আবুল হাসানাত মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো ভাঙ্গনের কারণে বড় হচ্ছে। তাই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে ভাবতে হচ্ছে সবাইকে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের চিন্তা থেকেই আমার এই নৌকা স্কুল মডেলটি এখন বিশ্ব পরিসরে পরিবেশবিদদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
তিনি আরো বলেন, নৌকা স্কুল আমাদের একটি সফল মডেল। সম্প্রতি চাটমোহর এলাকায় দেখা যায়, বিশেষভাবে তৈরি নৌকার প্রায় পুরোটা জুড়েই শ্রেণীক। অন্ততঃ ৩০/৩২ জন শিক্ষর্থী বেশ ভালোভাবেই বসতে পারে সেই শ্রেণীকক্ষে। পাঠ্যশিক্ষা ছাড়াও নৌকায় রয়েছে মাল্টিমিডিয়া শিক্ষার ব্যবস্থা, কম্পিউটারের সব ধরনের ব্যবহার ও প্রশিণের সুবিধা। নৌকা স্কুলের ছাদে (ছইয়ের উপর) বসানো আছে সৌরবিদ্যুতের সোলার প্যানেল। সেই প্যানেলই চার্জ করে দেয় কয়েকটি বিশাল ব্যাটারিকে। সেই ব্যাটারি দিয়েই চলে কম্পিউটার, জ্বলে আলো।
নৌকা স্কুলের শিক্ষার্থী চাটমোহর উপজেলার বরদানগর গ্রামে ছয় বছর বয়সী শিশু ওয়াসিম জানান, সেখান থেকে বই-খাতা-কলম সবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়। শিক্ষকরাও আন্তরিকতার সাথে পাঠদান করায়। আরেক শিক্ষাথী নঈম জানান, বর্ষাকালে আমারে ইলাকার পিরায় সব ইসকুলে পানি উঠে বন্ধ হয়্যা যায়। নৈকে ইসকুল বন্ধ হয় না। তাই একেনে পড়বের আসি। শুধু নৌকা স্কুলে পাঠদানই নয়। এতে আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থাটিও এলাকার শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের আলোর পথ দেখাচ্ছে। নৌকাতেই রয়েছে পাঠাগার আর ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা।
এ সুবিধা থেকে উপকৃত যুবক হাসিনুর জানান, এই নৌকা স্কুল আসার আগে আমরা ইন্টারনেট সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। এখন সব জানি। পাঠাগারে ভালো ভালো বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছি। এটা আমাদের কাছে অনেক বড় একটা পাওয়া। সিঁধুলাই স্ব-নির্ভর উন্নয়ন সংস্থার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সুপ্রকাশ সরকার জানান, ২০০২ সালে এই নৌকা স্কুল চালু করা হয়েছে। এতে পাঠাগার, কৃষি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, কম্পিউটার শিক্ষা, ইন্টারনেট ব্যবহার, সোলার সার্ভিস, অতিরিক্ত বিদ্যুতের হ্যারিকেন চার্জসহ অনেক কর্মসূচিই রয়েছে। স্থপতি আবুল হাসনাত রেজোয়ান বলেন, ১৯৯৮ সালে সংস্থাটি চালু হবার পরে আমরা ২০০২ সালে একটি নৌকা স্কুলে ৪টি কাস করার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আর এখন ৯টি নৌকা স্কুলে ৪০টি কাসে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছে।
