Skip to content

বেঁচে থাকার লড়াই

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ’৯০-এর দশকে উত্তর কোরিয়ার দুর্ভিক্ষে ডারউইন মতবাদের বাস্তবচিত্র দেখেছিল কোরিয়াবাসী। বেঁচে থাকার যুদ্ধে অপেক্ষাকৃত দুর্বলরা দ্রুত হারিয়ে গেল মৃত্যুর কবলে। উত্তর কোরিয়ায় মানবাধিকার তদন্তের জন্য জাতিসংঘ কমিশনের সামনে দুর্ভিক্ষ সময়ের মর্মান্তিক ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করলেন জি সিওং হো (৩১)। তখন জি সিয়ং ১৪ বছরের বালক। কয়লা চুরি করতে যেয়ে চলন্ত ট্রেনে বাঁ হাত ও বাঁ পা কাটা পড়ে তার। উত্তর কোরিয়া জোর গলায় কোন প্রকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে সব সময়। জাতিসংঘের নির্বাচিত তদন্ত কমিশনকেও তারা মানতে নারাজ। এবং কমিশনের সদস্যদেরকে উত্তর কোরিয়ার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তারা। জাতিসংঘ তদন্ত কমিশনের শুনানি এখন দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জি সিওং জানান, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধীরা উত্তর কোরিয়ার মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হয়। সমাজে তাদের কোন প্রয়োজন নেই এমন বিবেচনা করা হয়। দুর্ঘটনায় হাত পা কাটা যাওয়ার আগে জি সিওং নিজেও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতেন বলে স্বীকার করলেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার কোরিয়ান খাদ্যের অভাবে মারা গেছে। আঁস্তাকুড়ে ময়লা আবর্জনার মধ্যে খাবার খুঁজে কোন রকম বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। খাদ্য এটতাই অপ্রতুল ছিল যে, খাওয়ার জন্য অন্যের প্রতি নির্ভরশীল যারা বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধীদের জীবন ছিল সব থেকে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। জি সিওং বলেন, আমাদের শহরে অনেক শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছিল। কিন্তু খাদ্য পরিস্থিতি যখন কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করলো তাদের কাউকেই দেখা যায়নি। অর্থাৎ তাদের সবাই খাদ্যের অভাবে আগেই মারা গেছে। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসের এক দিন। কয়লা বিক্রি করে খাবার কেনার আশায় ট্রেন থেকে কয়লা চুরি করতে গিয়েছিলেন জি সিওং। দুর্ভাগ্যবশত চাকার নিচে পড়ে চিরকালের জন্য বাঁ হাত ও বাঁ পা হারান তিনি। এত জোরে চিৎকার করা সম্ভব তার আগে জানতাম না, বললেন জি সিওং। হাসপাতালে চেতনানাশক কোন ইঞ্জেকশন ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হয় তার। ছিল না কোন ক্রাচ যার ওপর ভর দিয়ে হাঁটবেন। সে সঙ্গে ছিল না চাকরি বাকরির কোন সম্ভাবনা। পরিবারের জন্য খাবার যোগাড় করার তাগিদে ২০০০ সালে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চীনে পাড়ি জমাতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফেরত যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন জি সিওং। এক সপ্তাহ আটকে রাখা হয় তাকে। পুলিশের হাতে ভয়াবহ প্রহারের শিকার হন তিনি। আমাকে পঙ্গু বলে সম্বোধন করে তারা বলে, বিকলাঙ্গ হওয়ার কারণে উত্তর কোরিয়ার জন্য অসম্মান বয়ে নিয়ে এসেছি আমি। ২০০৬ সালে জি সিওং চূড়ান্তভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। সে সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার মানবেতর জীবন যাপনের গল্প জনসাধারণের কাছে উপস্থাপন করেন। জাতিসংঘ তদন্ত কমিশনের সামনে বৃহস্পতিবার উপস্থিত অপর এক উত্তর কোরিয়ান হলেন কিম হিউক (৩২)। মাত্র সাত বছর বয়সে মাকে হারিয়ে সেদেশের ভাষায় ‘গোতজেবি’-তে পরিণত হন। যার অর্থ অনেকটা আমাদের দেশের টোকাই-এর মতো। রাস্তার শিশুদেরকে এ নামে ডাকা হয় বিশেষ করে যারা এতিম। যারা বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষা করে, আবর্জনায় খাবার খুঁজে আবার কখনওবা পেটের দায়ে চুরি করে। কিম জানায়, এতিম হওয়ার পর মানুষের কাছে চাইলে খাবার দিতো। কিন্তু দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পর দৃশ্যপট পুরোটাই পাল্টে যায়। রাস্তাঘাটে শিশুরা মারা যেতে শুরু করলে বিশেষ পুলিশ বাহিনী সকল গোতজেবি’কে ধরে নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র এবং এতিমখানায় পাঠিয়ে দেয়। সেখানেও অনেক শিশু মারা যায়। যে এতিমখানায় কিম ৩ বছর ছিলেন সেখানে কোন প্রকার খাবার ছিল না বলে জানান তিনি। খাওয়ার জন্য ছিল শুধুমাত্র ভুসি (ভুট্টার খোসা) যেটা খেলে কোষ্ঠ্যকাঠিন্য হতো। কিম টিকটিকি, সাপ, ইদুর আর ঘাস খেয়ে বেঁচেছিলেন। এতিমখানার মোট ৭৫ জন শিশুর মধ্যে ২৪ জন মারা যায়। কিম সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ধরা পড়েন। এবং তাকে ২০ মাসের জন্য রি-এডুকেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানের অবস্থা এতিমখানার মতোই ছিল। কিম জানায়, ২৪ জন একসঙ্গে ক্যাম্পে ঢুকেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন মাত্র ২ জন। ক্যাম্প থেকে ছাড়া পাবার পর ২০০০ সালের ডিসেম্বরে লুকিয়ে চীনে পালিয়ে যান এবং পরবর্তী বছর সিউলে পাড়ি জমান। বর্তমানে কিম ‘ইউনিফিকেশন মন্ত্রণালয়ের’ অধীনে তার অতীত অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দেন। ৯০ এর দশকের সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের বিভীষিকায় এ-তো দুজন মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। এরকম আরও কত জি সিওং, কত শত কিম রয়েছেন তা অনেকেরই অজানা।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫