বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)। আন্তর্জাতিক এই অর্থলগ্নিকারী সংস্থাটি বলেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা সন্তোষজনক নয়। নজরদারির অভাবে এই ব্যাংকগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রয়োজন রয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, এই এমওইউতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমন ক্ষমতা প্রদান করতে হবে যেন তারা গুরুতর অনিয়ম হলে এই ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে দিতে পারে। বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী সরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফররত আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে এক বৈঠকে এ বিষয়টি তুলে ধরেন বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। এক্সটেন্ডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি বা ইসিএফের আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে বাংলাদেশ ১০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। তিন বছরে (২০১২-১৪) মেয়াদে এই ঋণ পাওয়া যাবে।
ইতোমধ্যে ঋণের দুই কিস্তির প্রায় ৩০ কোটি ডলার বাংলাদেশ পেয়েছে। এই ঋণ নেয়ার কারণে বাংলাদেশকে অন্তত আইএমএফের গোটা ত্রিশেক শর্ত পরিপালন করতে হবে। এই শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন। ব্যাংকিং বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনায় অনেক বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলোর সার্বিক অবস্থা নিয়ে তারা প্রশ্ন করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের ঋণ-আমানত পরিস্থিতি, মূলধন ঘাটতি, শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আইএমএফ এই সব ব্যাংকের সার্বিক অবস্থায় দৃশ্যত উদ্বিগ্ন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। তারা দ্রুত সরকারি ব্যাংকের অবস্থার উন্নতির কথা বলেছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন দ্রুত একটি এমওইউ স্বাক্ষর করে তারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণের কথাও তারা বলেছে। একই সাথে হলমার্ক কেলেঙ্কারির কোনো সুরাহা হচ্ছে কি না তা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, গত এক বছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী বেসিক ও বিডিবিএল (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড) অবস্থা খারাপ হয়েছে।
২০১২ সালের মার্চ মাসের সাথে ২০১৩ সালের মার্চ মাসের তুলনা করে ব্যাংকগুলোর মন্দঋণ বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে এই সময় ব্যাংকে মন্দঋণ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এক বছরের ব্যবধানে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলে মন্দঋণ বেড়েছে ৯৩ দশমিক ৭৪ ভাগ, ১৮৭ দশমিক ২৭ ভাগ, ১৪৮ দশমিক ৩৬ ভাগ, ৩২১ দশমিক ৫০ ভাগ, ১৮২ দশমিক ৩০ ভাগ এবং ৯৫ দশমিক ৩৯ ভাগ।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যাংকগুলোর মন্দঋণের পরিমাণ ও হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।’ এই সময়ে ছয় ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়েছে ১৬.২৭, ১১.৩২, ১৫.৭৫, ২০.৫৯, ৪.৮৯ ও ৯.১৮ শতাংশ। শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য হচ্ছে,‘ শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা সম্পদের গুণগত মানের অবনতির দিকই নির্দেশ করে।
মূলধন ঘাটতি বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে ২০১২ সালের মার্চ মাসে এই ছয় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি না থাকলেও ২০১৩ সালের মার্চে এসে শুধু বিডিবিএল ছাড়া আর পাঁচটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি ছিল সোনালী ব্যাংকের, যার পরিমাণ পাঁচ হাজার ২৪৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল দুই হাজার ১২০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অন্য দিকে রূপালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল এক হাজার ১৬৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, এক হাজার ১১৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং ১২৮ কোটি ২১ লাখ টাকা।
একই সময়ে সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ও বিডিবিএলের প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতি ছিল চার হাজার ৬০৬ কোটি ৬৫ লাখ, দুই হাজার ৮৩ কোটি ৭৩ লাখ, ৮০৪ কোটি ১১ লাখ এবং ৭৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। তবে এই সময় ব্যাংকগুলোতে আমানত গ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জানা গেছে, আইএমএফের শর্ত পালন করতে গিয়ে শিগগিরই সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি মেটানোর জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রদান করবে। ইতোমধ্যে বাজেটে এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া রয়েছে।
