স্টাফ রিপোর্টার ॥ চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে রাজধানীর ব্যক্তিমালিকানাধীন ছাত্রী ও কর্মজীবী নারী হোস্টেলে মেয়েদের পোহাতে হচ্ছে নানা ধরনের ভোগান্তি। রাজধানীর এসব হোস্টেলে থাকা একাধিক ভুক্তভোগী জানান, চাকচিক্য আর চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার কথা বলা হলেও তেমন কোনো সুযোগই নেই এসব হোস্টেলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিজ্ঞাপনে সার্বণিক বিদ্যুৎ, পানি, উন্নত মানের খাবার, সুলভ মূল্যে ছিট পাওয়ার বিভিন্ন প্রলভন থাকলেও বেশিরভাগ হোস্টেলে বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখিয়ে বিনা নোটিশে বছরে একাধিকবার ভাড়া বাড়ানো, নিরাপত্তার অভাব, পানির সুব্যবস্থা না থাকা, ঘন ঘন লোডশেডিং, একরুমে চারজনের ছিটে ৭-৮ জনের কাছে ভাড়া দেয়াসহ নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
নারী নেত্রীরা বলছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। উচ্চশিা ও কাজের সূত্রে নারীরা শহরমুখী হচ্ছেন। ফলে বাড়ছে নারীদের আবাসনের চাহিদা। অথচ রাজধানীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র তিনটিসহ সারা দেশে মোট সাতটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল আছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাই রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন নারী হোস্টেল। ফার্মগেট ও মণিপুরীপাড়ায় নিকিতা, নিবেদিকা, গোধূলী, রিকো, তরুলতা, আপনঘর, আজিমপুরে তস্কন, নিবাস, মাহমুদা ছাত্রী হোস্টেল, এবং পূর্ব রাজাবাজার, মগবাজার, পলাশী, বকশীবাজার, নীলতে, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সিদ্ধেশ্বরীসহ অনেক জায়গায় ব্যক্তিমালিকানাধীন হোস্টেলে নারীদের থাকার ব্যবস্থা আছে। সেই সঙ্গে রয়েছে অনিয়মের নানা অভিযোগ। তবে এসব হোস্টেলে ছাত্রীদের ভোগান্তি ও নিরাপত্তার অভাব থাকলেও অধিক মুনাফা গুণে চলেছেন মালিকরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোনো একটি বাড়ি বা ফ্যাট ভাড়া নিয়ে খুলে বসেছেন এসব নারী হোস্টেল। এগুলোতে নেই কোনো ধরনের বিধিমালা। আর বিধিমালা না থাকার কারণে হোস্টেল মালিকরা অধিক লাভের আশায় চারজন থাকতে পারে এমন ঘরে আট জনের কাছে ভাড়া দেয়। আবার একটি রুমে হার্ডবোর্ড দিয়ে ভাগ করে একাধিক ঘর তৈরি করা হয়। এছাড়াও বেশিরভাগ হোস্টেলেই নেই বিনোদনের ব্যবস্থা। আবার কোনো কোনো হোস্টেলে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম টেলিভিশনটি একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা সারাতে লাগে কয়েক মাস।
আজিমপুরের তস্কন ছাত্রী হোস্টেলের মেহজাবিন বলেন, “অনেক সময় তিন-চার দিন পর্যন্ত লাইনে পানি থাকে না। কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে গেলে হোস্টেল ছেড়ে চলে যেতে বলে। এছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখিয়ে বিনা নোটিশে বছরে একাধিকবার ভাড়া বাড়ায়। কিন্তু সে অনুযায়ী কোনো সুযোগ-সুবিধা বাড়ায় না। ”
মালঞ্চ ছাত্রী হোস্টেলের শিল্পী জানান, এখানে প্রায়ই পানি থাকে না। বছরে দুইবার কোনো অযুহাত ছাড়াই ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হয়। খাবারের মানও তেমন ভালো না।
তস্কন হোস্টেলের কর্মকর্তা শামীম উদ্দিন জানান, বাজারে সব জিনিসপত্রের দাম চড়া তাই ভাড়া বাড়ানো হয়। লাইনে পানি না থাকলে আমাদের কিছু করার নেই।
কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এইসব হোস্টেলগুলোতে ভাড়া সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা না থাকায় মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতায় দিন দিন আরও মানবেতর হচ্ছে মেয়েদের জীবন। তবে, সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে কাছে এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ একটি নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হলেও এব্যাপারে কোনো সাড়া মেলেনি।
এ প্রসঙ্গে কর্মজীবী নারীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিরীন আখতার বলেন, “যদি হোস্টেলগুলো পরিচালনার জন্য কোনো নীতিমালা না থাকে তবে তা ত্রেবিশেষে মেয়েদের উপকারের চেয়ে অনেক বেশি তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।”
তিনি আরো বলেন, “যে হারে চাহিদা বাড়ছে, সে তুলনায় আবাসনের সুযোগ বাড়ছে না, তাই কর্মজীবী নারীদের জন্য আরো বেশি হোস্টেল নির্মাণ জরুরি।”
