বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ নাগরিক ব্যস্ততার ছোঁয়া এখন রসুই ঘরেও। অন্য সবকিছুর মতো পরিবর্তন এসেছে রান্নার অনুষঙ্গে। বাটা মসলার জায়গা দখল করে নিয়েছে গুঁড়ো মসলা। সে সুবাদে দ্রুতই বাড়ছে এর বাজার। যদিও মানের বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। এসব পণ্যের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন রাসায়নিক। কাঠ-কয়লার উপস্থিতিও ধরা পড়ছে কখনো কখনো। আর এসবই হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা ও তদারকির অভাবে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।
বণিক বার্তার নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা যায়, গুঁড়ো মসলায় ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অপদ্রব্য মেশানো হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে। গুঁড়ো হলুদের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় অ্যাংকার আটা মিশিয়ে এটি প্রস্তুত করছে অনেকে। মসলার রঙ ঠিক রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে সিনথেটিক রঙ। পরিমাণ বাড়াতে ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়োর ব্যবহারও কম নয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোই এটা বেশি করছে। তবে অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও এ ধরনের নানা অভিযোগ পেয়েছে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানটি।
হলুদ ও মরিচের গুঁড়োসহ বিভিন্ন ধরনের কারি মসলা বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত পণ্য। সনদ ব্যতিত এসব পণ্য বিক্রয় ও বিতরণ আইনত দণ্ডনীয়। তার পরও খোলাবাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে এগুলো। সেসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর পণ্যে রাসায়নিক পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি শঙ্কিত করে তুলছে ভোক্তাদের। বিএসটিআইয়ের পরীক্ষা ও সার্ভিল্যান্স টিম কয়েকটি কোম্পানির গুঁড়ো মসলায় বিষাক্ত রঙ, ইটের গুঁড়ো ও ধানের তুষের প্রমাণ পেয়েছে। এসব অপরাধে জড়িতদের বিভিন্ন সময় কারাদণ্ডও দেয়া হয়েছে। তার পরও বন্ধ হচ্ছে না এ অনৈতিক ব্যবসা।
২০১২-১৩ অর্থবছরের হিসাবে, শুধু গুঁড়ো মসলার ওপর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৪২টি মামলা দায়ের করেছে বিএসটিআই। জরিমানা আদায় হয়েছে ১৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। র্যার রাজধানীর শ্যামবাজারে ৬ হাজার ৪৬০ টন মসলা ধ্বংস করে। এছাড়া এ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বিএসটিআই সার্ভিল্যান্স টিম ১৯টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ১১টি নিয়মিত মামলা করেছে। খোলাবাজার থেকে ৫৭টি নমুনা সংগ্রহের পর তা পরীক্ষাও করা হচ্ছে। পরীক্ষার পর এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে বাজারে মানহীন গুঁড়ো মসলার ব্যাপকতার বিষয়টি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানহীন ও ভেজাল এসব মসলা ব্যবহারে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন কমছে, তেমন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে শিশুদের।
পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য বিশেষজ্ঞ এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়া ডিজিস রিসার্চ বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরিচালক ড. তাহামিদ আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, এমনিতে উচ্চমাত্রার অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এর ওপর খাদ্যপণ্যের অনিরাপদ বিপণন পুরো জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নৈতিক দায়িত্ব হয়ে গেছে এসব বন্ধ করার।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে, প্রতি বছর অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে দেশের ৫৩ হাজার শিশু। রক্তশূন্যতায় ভুগছে ৫১ শতাংশ শিশু। আর মায়েদের ক্ষেত্রে এ হার ৪২ শতাংশ। দৈহিক উচ্চতা অনুযায়ী ওজন ঠিক থাকছে না প্রায় ৩৬ শতাংশ শিশুর।
দেশের প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো সঠিক পন্থা মেনে উত্পাদন করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনেও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে উত্পাদন ও বাজারজাতকরণে ত্রুটির বিষয়টি উঠে এসেছে। ফসল কাটা থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় নানা ত্রুটি রয়েছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় তাপমাত্রা ও আদ্রর্তার তারতম্য হয় প্রতিনিয়ত। এছাড়া পণ্যের গ্রেডিং ও প্যাকেজিংয়েও রয়েছে দুর্বলতা। উদাসীনতা রয়েছে পণ্যে রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণের ক্ষেত্রেও।
এসব বিষয়ে জানতে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি কেউ। তবে বিএসটিআই মহাপরিচালক ইকরামুল হক বলেন, ভেজাল ও মানহীন খাদ্য উত্পাদনকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার বদ্ধপরিকর। খাদ্যে ভেজাল রোধে ও ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশে কয়েকটি আইন রয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়ন হলে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, প্রক্রিয়াজাত গুঁড়ো মসলার মূল পণ্য মরিচ, ধনিয়া, জিরা, হলুদ ও আদা নানা ধরনের ভেষজ ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। ধনিয়ায় রয়েছে ভিটামিন এ, বি, সি ও কে। সেসঙ্গে আছে ফসফরাস, পটাশিয়াম, লৌহের মতো খনিজ। মরিচে রয়েছে ভিটামিন এ, বি ও সি। কাঁচা ও পাকা উভয় মরিচেই রয়েছে খনিজ, আমিষ, ক্যালসিয়াম, ক্যারোটিন ও শ্বেতসার। হলুদে পাওয়া যায় খনিজ, আমিষ, চর্বি, শর্করা ও আঁশ। কাঁচা ও শুকনা উভয় আদাই শর্করা, খনিজ ও আমিষসমৃদ্ধ।
