Skip to content

শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস আজ

বাংলাভূমি২৪ডেস্ক ॥ আজ ১৪ ডিসেম্বর । শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের মর্মন্তুদ এক দিন। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ঊষালগ্নে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হারানোর দুঃসহ যন্ত্রণার দিন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের শেষলগ্নে বাঙালি যখন চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরের কালরাতে এদেশীয় নরঘাতক রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মেতে ওঠে দেশের বুদ্ধিজীবীদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে। বিজয়ের চূড়ান্ত মূহুর্তে বাঙালি মেধার সে নৃশংস নিধনযজ্ঞ আনন্দোন্মুখ জাতিসহ গোটা বিশ্বকেই সেদিন হতবিহ্বল করে তুলেছিল।

ভিন্ন প্রেক্ষাপটের বুদ্ধিজীবী দিবস: এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। শীর্ষস্থানীয় এক যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকরের মাধ্যমে বাঙালি জাতির কলঙ্কমুক্তির সূচনা ঘটেছে। সেই প্রেক্ষাপটে আবারও ফিরে এসেছে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের কালিমালিপ্ত দিনটি।

জাতির বহুল আকাঙ্খিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত ধাপ পেরিয়ে একাত্তরের অন্যতম শীর্ষ এক ঘাতক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ১ মিনিটে। শুরু হয়েছে বাঙালি জাতির কলঙ্কমুক্তির প্রক্রিয়াও। ৪২ বছর আগে জাতির ইতিহাসে লেপে দেওয়া এই কলঙ্কমুক্তির অপেক্ষায় এতদিন উন্মুখ হয়ে ছিল গোটা দেশের মানুষ। যখন সেই অপেক্ষার অবসানের সহৃচনা ঘটতে শুরু করেছে, তখনই উল্লসিত জাতির সামনে ফিরে শোকাবহ সেই দিনটি।

এর আগে থেকে বিচারের রায়ে দণ্ডিত হয়ে আছেন আরও কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী, যাদের কেউ কেউ আবার এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী হত্যায়ও সরাসরি জড়িত। অপেক্ষমান রয়েছে আরও দুই-একজনের বিচারের রায় ঘোষণাও। এ প্রেক্ষাপটে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ ও রায় কার্যকরের মাধ্যমে কলঙ্কমুক্তির এই প্রক্রিয়ার শেষ হওয়াটাই এই মূহুর্তে গোটা জাতির প্রত্যাশা।

র্মন্তু সেই ইতিহাস:

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দুই দিন আগে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে ঘাতকচক্র কেবল ঢাকা শহরেই প্রায় দেড়শ’ বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশার কৃতি মানুষকে চোখ বেধে অপহরণ করে নিয়ে যায় অজ্ঞাতস্থানে। সান্ধ্য আইনের মধ্যে সেই রাতে তালিকা ধরে ধরে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী ও পদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের ঘর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে হত্যা করে ফেলে রাখা হয় নিস্তব্ধ ভুতুড়ে অন্ধকারে।

পরদিন সকালে ঢাকার মিরপুরের ডোবা-নালা ও রায়েরবাজার ইটখোলাতে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় হতভাগ্য এসব বুদ্ধিজীবীর নিথর দেহ। এ যেন বাঙালির সংস্কৃৃতি ও সভ্যতার এক নির্মম বধ্যভূমি। কারও শরীর বুলেটবিদ্ধ, কারও বা অমানুষিক নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত। হাত পেছনে বেধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নাড়ি-ভুড়িও বের করে ফেলা হয়েছিল অনেকেরই। আর ঘুম থেকে জেগে ওঠা স্বাধীনতা ছুঁইছুঁই উল্লসিত মানুষ স্বজন হারানোর সেই কালরাত্রির কথা জানতে পেরে শিউরে উঠেছিল।

তবে ১৪ ডিসেম্বরকে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের শিকারের দিন হিসেবে স্মরণ করা হলেও মূলত ১০ ডিসেম্বর থেকেই ইতিহাসের এ ঘৃণ্যতম অপকর্মের সূচনা হয়। পুরো সপ্তাহ জুড়ে এদের তালিকায় একে একে উঠে আসে অসংখ্য বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী মানুষের নাম। পরে কৃতি এসব বুদ্ধিজীবীর তালিকাই তুলে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র ক্যাডার গ্রুপ কুখ্যাত আলবদর ও আলশামস বাহিনীর হাতে। নেপথ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী। রাতের আঁধারে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি ও বেয়নেট খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা শুরু হয় ১০ ডিসেম্বর থেকেই, যার চূড়ান্ত নীলনকশার বাস্তবায়ন ঘটে ১৪ ডিসেম্বর। আর নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞে সেদিন স্থবির হয়ে গিয়েছিল সব কিছু। মুখ থুবড়ে পড়েছিল স্বাধীনপ্রায় শিশুরাষ্ট্র বাংলাদেশ। হয়ে পড়েছিল মেধাশূন্য। তখনও স্বজনের রক্তের ওপর উল্লাসে নৃত্যরত এদেশীয় নরঘাতকরা।

বাঙালি জাতির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামে এসব বুদ্ধিজীবী নিজেদের মেধা, মনন ও লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগঠকদের প্রেরণা জুগিয়েছেন। দেখিয়েছেন মুক্তির পথ। গোটা জাতিকেও উদ্দিপ্ত করেছেন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। আর সেটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের জন্য। স্বাধীন রাষ্ট্রের জš§ যেন কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না স্বাধীনতাবিরোধী এদেশীয় কুলাঙ্গার চক্রের। তাই ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য নৃশংস হত্যাযজ্ঞের গোপন ফন্দি আঁটে নরঘাতকের দল।

একাত্তরের ডিসেম্বরের এই হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা আজও নিরুপণ করা যায়নি। তবে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে, সে অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী এবং ১৬ জন শিল্পী-সাহিত্যিক-প্রকৌশলী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন, ড. জিসি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনওয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজুদ্দিন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমদ, লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আনম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, নতুন চন্দ্র সিংহ, আরপি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, সায়ীদুল হাসান, হবিবুর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীনসহ আরো অনেকে।

দিনের কর্মসূচি:

যথাযোগ্য মর্যাদা ও শোকের আবহে পালিত হবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শোকে আপ্লুত মানুষের ঢল নামবে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের মর্মন্তুদ যন্ত্রণার স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মতিসৌধ, রায়েরবাজার বধ্যভূমি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতিস্তম্ভে। অর্পণ করা হবে পুষ্পার্ঘ্য। স্বজনহারা মানুষের বুকের ভেতর চেপে রাখা কান্নায় ভিজে উঠবে বেদিমূল। ভিজে উঠবে স্বজনের জন্য আনা ভালবাসার অর্ঘ্য। দেশের সর্বত্র এদিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। শোকের প্রতীক কালো পতাকাও উড়বে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বাণী দিয়েছেন। পৃথক বাণীতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন তারা।

এ উপলক্ষে শনিবার সকাল ৭টায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর সর্বসাধারণের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি। রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধেও অনুরুপ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠিত হবে।

দেশব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনও নিয়েছে নানা কর্মসূচি। এর মধ্যে আছে, শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা, গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্বেচ্ছায় রক্তদান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে রয়েছে, সূর্যোদয়ের ক্ষণে (সকাল ৬টা ৪৩ মিনিট) দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু ভবনসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকাল ৭টা ৫ মিনিটে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, ৭টা ৩৫ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতি ও ৮টা ৫ মিনিটে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিকেল ৩টায় খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনষ্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা। দলের সভাপতিম-লীর সদস্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

বিএনপিও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি সৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করবে।

এছাড়া জাতীয় পার্টি, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, গণফোরাম, ন্যাপ, বাসদ, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অপর্ণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করবে।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫