স্টাফ রিপোর্টার ॥ মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার রায় ডিসেম্বর মাসেই ঘোষণা হতে পারে বলে জানা গেছে।
মামলা সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর মুহাম্মদ আলী বলেন, এ মাসেই তাঁর মামলার রায় ঘোষণা করা হবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, এক মাস অতিক্রম হয়ে গেছে মামলার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সুতরাং এ মাসেই রায় ঘোষণা হবে।
এর আগে দুই ট্রাইব্যুনালে মিলে মোট নয়টি মামলায় ১০ আসামির বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। নিজামীর মামলার রায় ঘোষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টি মামলার রায় ঘোষণা পূর্ণ হবে এবং আসামির সংখ্যা হবে ১১ জন।
এর আগে এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের ৯০ বছর জেল, নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করা হয়।
নিজামীর মামলার কর্য্যক্রম শেষ করে গত ২০ নভেম্বর রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর। নিয়ম হলো মামলা শুনানি করেন যে বিচারপতিগণ রায়ও ঘোষণা করেন তাঁরা। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসেবে অবসর গ্রহণের আগেই অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই নিজামীর মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়েই বিচারপতি ফজলে কবীর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সানাউল হক বলেন, ‘আইনানুযায়ী যে বিচারক মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, তিনিই মামলার রায় লিখবেন এবং ঘোষণা করবেন। সুতরাং চেয়ারম্যান বিচারপতি অবসরে যাওয়ার আগে রায় লিখে যাবেন।’
তিনি বলেন,’ নিয়ম হলো বিচারপতির বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হলে তাকে অবসরে যেতে হবে, তাই তাকে অবসরে যেতেই হবে। তবে তার আগে রায় ঘোষণা করে যাবেন তিনি।
সানাউল হক বলেন, ন্যাচারাল হলো রায় হবে আইন অনুযায়ী।‘আমি মনে করি (এটিএম ফজলে কবির) রায় ঘোষণা করে যাবেন। অর্থাৎ এ মাসেই নিজামীর রায় ঘোষণা করার দাবি রাখে।
তিনি বলেন, নিজামীর ক্যাপিটাল পানিসমেন্ট হবে এটাই প্রত্যাশা করি। ভিকটিম ও সাক্ষীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দাবি হলো অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তারা দ্রুত বিচারের সম্মুখীন হোক। তাই নিজামীর মামালার রায় ঘোষণার পরে আপিল শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত হোক এটাই বিচার প্রার্থীদের প্রত্যাশা।
প্রসিকিউটর রানাদাস গুপ্ত জানান, এ মাসেই নিজামীর মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে। তার মামলার কার্য্যক্রম শেষ হয়েছে প্রায় এক মাস অতিক্রম হয়েছে। অতি দ্রুতই রায় ঘোষণা করবেন। তার আশা করি সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। তবে কি রায়ে কি দন্ড ঘোষণা করবেন একমাত্র আদালতই নিশ্চিত করবেন।
জানতে চাইলে প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদ সীমন বলেন, যে কোন সময় নিাকজামীর মামলার রায় দিতে পারেন। তার আগে অবশ্য দিনক্ষণ ঠিক করবেন ট্রাইব্যুনাল-১। তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগই প্রমাণ করতে পেরেছি। সুতরাং তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।
সূত্র জানায়, বিচারপতির অবসর গ্রহণের আগে তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে হাইকোর্টে স্থানান্তর করা হতে পারে। সে অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বর তাকে হাইকোর্টে স্থানান্তর এবং ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর দেয়া হবে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ তে তার বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হবে। সে অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল-১ এ চলমান অন্যসব মামলার কার্যক্রম শেষ না করেই ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যেতে হচ্ছে এটিএম ফজলে কবিরকে।
গত ১৭ থেকে ১৯ নভেম্বর তিনদিন নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও তাজুল ইসলাম। তার আগে গত ২০ নভেম্বর প্রসিকিউশনের পক্ষে পাল্টা যুক্তি ও আইনি পয়েন্টে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, ড. তুরিন আফরোজ ও মোহাম্মদ আলী।
মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মুহাম্মদ আলী বলেন নিজামীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডই হতে পারে উপযুক্ত শাস্তি, অন্যদিকে নিজামীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি খালাস পাবেন।
প্রসিকিউটর মো. আলী বলেন, ‘নিজামীর বিরুদ্ধে আনিত ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ৮ নম্বর অভিযোগ ব্যতীত অবশিষ্ট ১৫টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে বলে আশা করছি।’
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে নিজামী ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা ছিলেন, তাকে (পি-ভট) সকল অপরাধের হোতা। নিজামী ছিলেন রিং লিডার। তার নির্দেশেই সকল অপকর্ম সংঘটিত হয়েছে।
তিনি বলেন ১৬টি অভিযোগের ৪টি হলো পেপারকাটিং ডকুমেন্টরি অভিযোগ, অন্যদিকে ১২ টি হলো ওড়াল এভিডেন্স এবং পাকিস্তানের লাহোরের এক লেখকের লেখা ইসলামলে নামে সন্ত্রাস বইটি রেফারেন্স হিসেবে আছে। তারসঙ্গে ২৬ জন সাক্ষী তাদের জবানবন্দি পেশ করেছেন। তাই নিজামীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড কামনা করছি।
অপরদিকে জানতে চাইলে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘একাত্তর সালে সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে নিজামীর যে সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ধরনের প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে মামলা থেকে মাওলানা নিজামী খালাস পাবেন।’
নিজামীর পক্ষে ১০ হাজার ১১১জন সাক্ষীর তালিকা থেকে ৪জন সাফাই সাক্ষীর অনুমতি দিয়ে গত ৬ অক্টোবর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ।
নিজামীর বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ আগস্ট থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রসকিউশনের সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক, সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ, তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৬জন সাক্ষী।
২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এবছর ২৮ মে ১৬টি অভিযোগ এনে নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত।
তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, র্ধষণ, উস্কানি, সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মোট ১৬টি অভিযোগ আনা হয়।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
অন্যদিকে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ট্রাব্যুনাল-২ এ মোট ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। যার মধ্যে জামায়াতের সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মো.কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ড, বিএনপি নেতা আব্দুল আলীমের আমৃত্যু কারাদন্ড এবং একমাত্র আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার যাবৎজীবন দন্ড ঘোষণার পরে পরবর্তী কার্যক্রম শেষে আপিল বিভাগের নির্দেশে ফাঁসি কার্যকর করেছেন সরকার।
