বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ পরিস্থিতির সমাধান না হলে উলামায়ে কেরামদের নিয়ে ‘দেশ ও ঈমান রক্ষা মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন হেফাজতের নেতারা। একই সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সমাবেশ করতে বাধা দেয়ায় সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলের একাধিক নেতা। গতকাল সকাল থেকে হাটহাজারী মাদরাসায় জরুরি বৈঠকে বসে হেফাজতের অন্তত ৫০ জন নেতা। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের শীর্ষ আমীর আল্লামা শফী।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে দলের শীর্ষ নেতারা মানবজমিনকে জানান, গত ১২ ও ১৩ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দান ও ২৪শে ডিসেম্বর ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামকে মহাসম্মেলন করতে না দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। করণীয় ঠিক করতে গতকাল বুধবার বেলা ২টায় হাটহাজারী মাদরাসায় কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ এক জরুরি বৈঠক বসে।
বৈঠকে সরকারের প্রতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নেতারা বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকার সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট কায়দায় বাক-স্বাধীনতাসহ জনগণের মৌলিক অধিকারকে হরণ করছে। জোর-জুলুম ও অন্যায়ভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার চেষ্টাসহ নাগরিকদেরকে এসবের প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না। দেশের সর্বত্রই আজ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। একদিকে সরকার ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদীদেরকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে উলামা-মাশায়েখদেরকে ওয়াজ-মাহফিল, তাফসির মাহফিল ও ইসলামী সম্মেলন করতে দিচ্ছে না। একটি বৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত দেশের নাগরিকগণ পবিত্র কোরান-হাদিস ও ইসলামের বাণী প্রচার করতে সরকারিভাবে বাধাগ্রস্ত হবেন- এটা কল্পনাও করা যায় না।
আজ ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী কথিত গণজাগরণ মঞ্চের রাস্তা দখল ও সমাবেশ করতে অনুমতির প্রয়োজন হয় না, অথচ ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ হওয়া সত্ত্বেও তৌহিদী জনতাকে ওয়াজ মাহফিল ও ইসলামী সম্মেলন করতে অনুমতি দেয়া হয় না। মূলত ধর্মনিরপেক্ষ নীতির আড়ালে বর্তমান সরকার এই দেশ থেকে ইসলাম ও ঈমানী চেতনাকে মুছে দিতে চাচ্ছে।
বর্তমান সরকার নাস্তিক্যবাদী ও ইসলাম বিদ্বেষীদের প্ররোচণায় সংবিধান থেকে মহান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসের নীতিকে বাদ দিয়ে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা তথা নাস্তিকতা চালু করছে। শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সকল পর্যায়ে ইসলামের উপর নগ্ন আঘাত হেনেছে। দাড়ি, টুপি, নামাজি ও হিজাবধারী মা-বোনদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সরকারের ইসলামবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ নীতির কারণে দেশের সকল স্তরে নাস্তিক্যবাদীরা ইসলামবিরোধী নীতি ও প্রথা চালু করার প্রয়াস চালাচ্ছে। এ সরকার হিন্দু, বৌদ্ধসহ ভিন্নধর্মাবলম্বীদের সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুলিশ-র্যাব দিয়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিলেও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা দূরে থাকুক বরং নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইসলামবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। এদেশের কোটি কোটি মুসলমান এটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, জনসমর্থনহীন সরকার অন্যায়ভাবে ক্ষমতাকে আঁকড়ে রাখার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য প্রতিবাদী ও নিরীহ জনতাকে গুলি করে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। হামলা, মামলা ও গুমের পথ বেছে নিয়েছে তারা। সরকার প্রতিবাদী জনতা ও নেতৃবৃন্দকে হামলা-মামলা খুন-গুম ও বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে হিংস্র উপায়ে নাগরিক অধিকার হরণ করার মতো বর্বরতা শুরু করছে। সরকারের একগুঁয়ে নীতির কারণে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতায় চাল-ডাল, নিত্য ব্যবহার্য খাদ্য ও আসবাবপত্রসহ দ্রব্যমূল্য এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বৈঠকে সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, নায়েবে আমীর আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী, মহাসচিব আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী, আল্লামা তাজুল ইসলাম, আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীব, মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা সলিম উল্লাহ, মাওলানা লোকমান হাকিম, মাওলানা মুহাম্মদ শফি, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা আাব্দুল করিম, মাওলানা নাজমুল হাসান, মাওলানা শফিকুদ্দীন, মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মাওলানা আনাস মাদানী, মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী, মাওলানা মুনির আহমদ, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, মাওলানা মীর মুহাম্মদ ইদরিস, মুফতি ফখরুল ইসলাম, মাওলানা হাসান মুরাদাবাদি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে হেফাজত নেতৃবৃন্দ সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, নাস্তিক্যবাদের পক্ষ ত্যাগ করে অবিলম্বে গণমানুষ ও তৌহিদী জনতার উপর জুলুম-অত্যাচার বন্ধ করুন। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণসহ হামলা, মামলা ও মানুষ হত্যা বন্ধ করুন। দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিবেশ স্বাভাবিক করে অবিলম্বে সকল দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা নিয়ে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করুন। দেশ ও জনগণের জন্য উলামায়ে কেরামেরও দায়-দায়িত্ব রয়েছে, তারা চুপ করে বসে থাকবে না। দ্রুত বিদ্যমান পরিস্থিতির সমাধান না হলে উলামায়ে কেরাম দেশব্যাপী সম্মিলিতভাবে তৌহিদী জনতাকে সঙ্গে নিয়ে ‘দেশ ও ঈমান রক্ষার মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারকে অত্যাচার ও ফ্যাসিস্ট কায়দায় দেশ পরিচালনা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করবে।
