লাইফস্টাইল ডেস্ক ॥
সংবাদপত্রের পাতায়‘পাত্রীচাই’ বিজ্ঞাপনে দেখা যায় পাত্রপক্ষের পছন্দ। পাত্রীর কী কী গুণচাই তার তালিকা থাকে। আমরা জানতে চেয়েছি আজকের আধুনিক শিক্ষিত অবিবাহিত মেয়েতাঁর জীবনসঙ্গী হিসেবে কেমন ছেলে চান। নারীমঞ্চের প্রতিনিধিরা কথা বলেছেন ১০০ জন মেয়ের সঙ্গে। তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কেউ বা পড়াশোনা শেষকরে চাকরি করছেন। হবু স্বামীর পেশার ক্ষেত্রে মেয়েদের পছন্দের ভিন্নতা দেখা গেলেও সম্মানজনক পেশা চেয়েছেন বেশির ভাগ। কিন্তু জীবনসঙ্গী হিসেবে প্রায়সবাই চেয়েছেন একজন ভালো মনের মানুষ।
পত্রিকার পাতায় ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনগুলোয় চাওয়া হয় পাত্রীর নানা যোগ্যতা। পাত্রী কতটা শিক্ষিত হবেন, দেখতে সুশ্রী, সংসারী, ধর্মপরায়ণ ইত্যাদি নানা রকম শর্ত। শুধু বিজ্ঞাপন নয়, কনে দেখার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বিয়ের পাত্রী কেমন হবেন, তার একটি নির্দেশনা আগে থেকেই দেওয়া থাকে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে। পাত্রের পক্ষ থেকেও। পাত্রী নির্বাচনে পছন্দ-অপছন্দ, যোগ্যতার ব্যাপারটি আছে। এখন দেখা যাক বিয়ের ক্ষেত্রে কেমন পাত্র পছন্দ করেন আমাদের তরুণীরা? জীবনসঙ্গী হিসেবে কেমন পুরুষ পাশে পেতে চান আধুনিক তরুণী?
এ প্রশ্ন সামনে রেখে নারীমঞ্চের প্রতিনিধিরা মোট ১০০ জন তরুণীর সঙ্গে কথা বলেছেন। সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী এবং পড়াশোনা শেষ করে সদ্য কর্মক্ষেত্রে যোগদান করা অবিবাহিত তরুণীদের মধ্য থেকে এই ১০০ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে। খুব কাছের বন্ধু, নয়তো পরিবারের কাছের মানুষ ছাড়া মেয়েদের কখনো এ বিষয়ে অনুভূতি ভাগাভাগি করা হয় না।
নারীমঞ্চের এই প্রশ্ন জানতে চাওয়ায় অনেকেই হেসে নিয়েছেন একচোট। মনের আনন্দে। মনের কথা বলতে পারার উত্ফুল্লতায়। তরুণীরা অকপটে জানিয়েছেন তাঁদের পছন্দ-অপছন্দের কথা। ‘যেহেতু এটা সারা জীবনের ব্যাপার, তাই একটু হিসাব কষে, ভেবেচিন্তে পথ শুরু করাই ভালো। পরবর্তী সময়ে আফসোস করার চেয়ে কাজ সমাধার আগেই ভাবব। আমার পরিবারও ভেবেচিন্তে, পরামর্শ করে দেখে এখন প্রস্তাবগুলো। তবে আমার চাওয়া শুধু একজন ভালো মনের মানুষ।’ জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে পড়ুয়া এক তরুণী।
‘যে আমাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে, আমার জীবনকে জটিল, কষ্টদায়ক করে তুলবে না, আমাকে বুঝবে তেমন পাত্রই চাই। পেশার ক্ষেত্রে চিকিৎসকহলে ভালো হয়। এটা সম্মানজনক পেশা।’ জানালেন বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রী। বিয়েতে পাত্র নির্বাচনে সর্বাগ্রে আসে পেশার বিষয়টা। বেশির ভাগের অভিমত, পরবর্তী জীবন যেন সম্মানজনক, স্বচ্ছল থাকে সে জন্য পেশার গুরুত্ব অনেক বেশি। তরুণীদের পছন্দের তালিকায় আছে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা। তবে এগিয়ে আছে সম্মানজনক যেকোন পেশা। বেসরকারি সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত পাত্রের চাহিদাও বেশ। অধিক পছন্দ বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত পাত্র। প্রকৌশলী, চিকিত্সকেরা পছন্দের দিক থেকে আগের অবস্থানে ।
সম্মানজনক পেশা বলে অনেক তরুণী চান তাঁর স্বামী যেন ডাক্তার হন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থী তাঁর অভিমত জানান, ‘যেহেতু আমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি, সেহেতু আমি চাই যেন আমার স্বামী এই ক্যাম্পাসেরই হয়। প্রকৌশলী হয়।’ আবার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা আরেক তরুণী বললেন, ‘যেহেতু আমি প্রকৌশলী হচ্ছি, যদি আমি প্রকৌশলী স্বামী বেছে নিই, তবে কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা সংসারে চলে আসবে। আমি সেটা চাই না। সংসারটা হবে শান্তির জায়গা, প্রতিযোগিতার নয়। চিকিৎসক, প্রকৌশলী ছাড়া যোগ্য যেকোনো পেশার জীবনসঙ্গীই তাই আমার পছন্দ।’
চিকিৎসাপেশায় নিয়োজিত তরুণীরা অবশ্য জীবনসঙ্গী হিসেবে চিকিৎসকই চান। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে অনারারিশিপ করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক শিক্ষার্থী জানালেন, ‘পেশা গড়ার জন্য আমার কর্মক্ষেত্রকে আমার স্বামীর বুঝতে হবে। তাই তার চিকিৎসকহওয়া জরুরি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৯ জন তরুণীর পেশার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো পছন্দ নেই। সম্মানজনক যেকোনো পেশা হলেই চলবে। তবে যোগ্যতায় তাঁদের চেয়ে যেন একটু উচ্চ হয়। যেসব তরুণী ব্যবসায় প্রশাসনে পড়ছেন, তাঁদের পছন্দ ব্যাংক কর্মকর্তা। সাংবাদিকতায় জড়িত এবং পড়াশোনা করছেন এমন তিনজন তরুণী জানালেন, পাত্র হিসেবে সাংবাদিক তাদের তেমন পছন্দ নয়। তবে একজন আত্মপ্রত্যয়ী তিনি নিজে সাংবাদিক হবেন এবং বরও সাংবাদিক বেছে নেবেন। চোখেপড়ার বিষয় হলো ১০০ জনের মধ্যেপ্রবাসীপাত্রের প্রতি আগ্রহ ছিলএকজনের। আরনির্দিষ্ট করে ব্যবসায়ী পাত্রের প্রতি কারও আগ্রহ দেখা যায়নি। তাঁরা স্থিতিশীল উপার্জনের প্রতি বেশি জোর দিয়েছেন।
পেশার সঙ্গে তরুণীরা সমান জোর দিয়েছেন জীবনসঙ্গী হিসেবে যাঁকে চান তাঁর মন-মানসিকতার ওপর। ‘আমি আর কিছু চাই না, শুধু একজন ভালো মনের মানুষ চাই। যে আমাকে বুঝবে, ভালোবাসবে, আমার প্রতি শ্রদ্ধা রাখবে।’ অনেকটা আবেগভরা কণ্ঠে জানালেন শাবিপ্রবির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী। মানবিক গুণাবলির মধ্যে সর্বোচ্চ পছন্দ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্বামী। স্বাধীনতায় বিশ্বাসী উদার স্বামী। বন্ধুসুলভ এবং যার মধ্যে জীবনবোধ, রসবোধ থাকবে। স্ত্রীর প্রতি, সম্পর্কের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা থাকতে হবে। সম্পর্কে সততা, স্বচ্ছতা থাকতে হবে। সত্ ও দায়িত্ববান জীবনসঙ্গী। ১০০ জন তরুণীর সবারই কথায় ঘুরেফিরে এ মানবিক গুণগুলো চাওয়া ছিল আন্তরিকভাবে। অনেকেই এক কথায় বলেছেন, ‘শতভাগ ভালোমানুষ হয়তো পাব না, তবে কিছুটা হলেও যেন ভালো মানুষ হয়।’
শৈশব থেকে একজন মেয়েশিশুর প্রথম পুরুষ থাকে তার বাবা। বাবার আশ্রয়, বটবৃক্ষের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারটি মেয়েরা তার জীবনসঙ্গীর মধ্যেও প্রত্যাশা করেন। জরিপে অংশগ্রহণ করা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী এমনই বললেন, ‘আমি আমার বাবার মতো স্বামী চাই। নির্ভরশীলতায় যতœ পাওয়ার মতো আরেকজন চাই।’
বাবার যতœ-আশ্রয়ের ব্যাপারটা যেমন তরুণীরা চান, তেমনটি অনেকেই চান না পেশার ক্ষেত্রে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এক তরুণী জানান, ‘পরিবারের অনেকেই শিক্ষক। প্রতি মুহূর্তে শুধরে দেওয়ার জন্য ভুল ধরেন। এ ছাড়া এখনকার শিক্ষকেরা যেন অনেকটাই রসবোধহীন। জীবনটাকে শুধু পড়ার মাঝেই সীমিত রাখতে চান। এ জন্য শিক্ষক পাত্র চাই না।”
সরকারি কর্মকর্তা মেয়ে চান না তাঁর স্বামী সরকারি চাকরি করুক। ‘মাকে দেখে এসেছি প্রতি মুহূর্তে হিসাব করে, টানাপোড়েনে সংসার চালাতে। কিন্তু আমি সংসারে একটু সচ্ছলতা চাই। তাই সরকারি চাকরিজীবীকে বিয়ে করতে চাই না।’
পেশা, মন-মানসিকতার পাশাপাশি চলে আসে বাহ্যিক গঠনের, দেখতে কেমন হবে ব্যাপারটিও। উচ্চতায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির অধিকারী ঢাবির এক ছাত্রী বলেন, ‘আমি তো আমার উচ্চতার সঙ্গে যায় কি না এমন ছেলেই দেখব। সেই সঙ্গে স্মার্টনেসও দেখব।’
একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত তরুণী জানালেন, ‘পাত্র কোনোভাবেই ফর্সা হতে পারবে না। শ্যামলা কিংবা কালোর মধ্যে পুরুষালি চেহারাই আমাকে আকর্ষণ করে।’
ঢাকা সিটি কলেজের স্নাতকোত্তরের এক ছাত্রী জানালেন, ‘খুব ফিটফাট নয়, একটু অগোছালো চটপটে ছেলেই আমার পছন্দ। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অবশ্যই হতে হবে।’
অধিকাংশ তরুণীর ক্ষেত্রেই বাহ্যিক গড়ন ততটা মুখ্য নয়, চলনসই হলেই হলো। শুধু মনটা ভালো হলেই হলো। ১০০ জন তরুণীর ১০০ টা মতের মধ্যে একটা চাওয়ায় মিল ছিল সবার মধ্যেই। আর তা হলো সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ভালো মন-মানসিকতার পাত্র। বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে যার সঙ্গে নির্বিঘ্নে কাটাতে পারবেন সংসারজীবন।
পছন্দের অগ্রাধিকার:
অবশ্যই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হবে।
উদার মন-মানসিকতার হতে হবে।
সত্, দায়িত্বশীল, চরিত্রবান পুরুষ হবে।
সম্পর্কেশ্রদ্ধা, সততা ও স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী হবে।
বন্ধুসুলভ, রসবোধসম্পন্ন হতে হবে।
অপছন্দ যা:
নারীঘটিত চারিত্রিক ত্রুটি মেনে নেব না।
প্রতারণা সহ্যকরব না।
অন্যায়কর্তৃত্ব মেনে নেব না।
বাচাল, হ্যাংলা হতে পারবে না।
বাহ্যিক সৌন্দর্য:
উচ্চতায় লম্বা হতে হবে।
পৌরুষদীপ্ত চেহারা।
অতিরিক্ত ফর্সা হওয়া যাবে না।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে।
ক্রমিক পেশা কতজন:
১. সম্মানজনক যেকোনো পেশা ২৯
২. বহুজাতিক/করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ১৪
৩. চিকিৎসক ১২
৪. প্রকৌশলী ১১
৫. ব্যাংক কর্মকর্তা ১০
৬. সরকারি কর্মকর্তা (বিসিএস ক্যাডার) ৮
৭. বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ৬
৮. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ৪
৯. সামরিক কর্মকর্তা ৩
১০. শিল্পী ২
১১. সাংবাদিক
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ বিদেশী পাসপোর্টধারী তথা যারা ইউরোপ আমেরিকাতে থাকেন তাদের জন্য দুঃসংবাদ, প্রছন্দের পাত্রের তালিকায় প্রবাসী ছেলেদের এখন কেউ প্রছন্দ করেনা, বিশেষত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো!
